স্টাইল হচ্ছে একটা স্বপ্নময় ব্যাপার

স্টাইল হচ্ছে একটা স্বপ্নময় ব্যাপার

অকারণেই আসে, তীব্র অবসাদে ডুবিয়ে দেয়। মাঝে মাঝেই এমন হয়। কোনো কোনো সকালে উঠে ‘মনে হয় এই জগৎ-জীবন সমস্তই মিথ্যা। পড়াশোনা, আঁকাআঁকি সবই প-শ্রম। তখন ভীষণভাবে বিষণœ বোধ করি।...’

শিল্পী গণেশ পাইনের সাক্ষাৎকার পড়েছিলাম। শিল্পী বলেই হয়তো এতখানি অকপট। সত্য ভাষণের দরজা হাট করে খোলা।

ওঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল:

শিল্পীদের মধ্যে গোষ্ঠী কোন্দল বা রেষারেষি আছে। সেসব কি আপনাকেই স্পর্শ করে? আপনি কি কখনো তার শামিল হন?

গণেশ পাইনের উত্তর

-না, শামিল হতে চাই না। কাজের ব্যাপারে অথবা ছোটখাটো ব্যক্তিগত ব্যাপারে যে ব্যর্থতা তা থেকেই তো লাঠালাঠিগুলো বাধে। কাজেই বিরোধের এলাকাগুলো থেকে সরে এসে নিজেকে সরিয়ে রাখি। কিছু লোক আছে লড়াকু লড়ে জিততে চায়। কিছু লোক হয়তো লড়াইটা অপছন্দ করে। মানে প্রতিযোগিতা আর সাফল্যের উল্লাসÑ দুটোই আমার অপছন্দ।

এবারের প্রশ্ন প্রভাব নিয়ে।

-আপনার ছবিতে অন্য কারও প্রভাব আছে কি না? গণেশ পাইনের বিনীত উত্তর

-আমার কাজে পূর্বসূরিদের প্রভাব প্রবলভাবে রয়েছে।

...আমি তো স্বয়ম্ভু নই।

কোনো লুকোচুরি খেলা নেই। পূর্বসূরিদের অধ্যয়ন ও অনুশীলন তার কাছে অবশ্যপালনীয়, সেটা তিনি জানিয়ে দিলেন।

শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদেরকে এ ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় একাধিকবার।

হঠাৎই হাতে এলো আইরিশ কবি ডায়েলের ইন্টারভিউ। ঔৎসুক্যের ঘোর নিয়ে পড়ি। পড়তে পড়তে দেখি এক জায়গায় প্রশ্ন করা হচ্ছে তাঁকেও।

-আপনার লেখায় অন্য কারও প্রভাব সম্বন্ধে কি আপনি সচেতন?

-কি জানো, ওই শব্দটা সম্বন্ধে আমি যে খুব সচেতন তা নয়। কারণ, আমার যা ভালো লাগে তাই-ই কপি করি। খামচে তুলে নিই।...তুমি যখন INFLUENCE কথাটা ব্যবহার করো, তার মানে দাঁড়ায় আমি যেন অর্ধেক সচেতন হয়ে অন্যের রচনা আত্মসাৎ করেছি নিজের বলে। কিন্তু আমি শুধু পড়ার আনন্দের জন্যই পড়ি না। পড়ি একজন ভ্রমণকারীর ভঙ্গিতে, যখন ভালো কিছু পাই, অনুশীলন করি, ভাবি আর চেষ্টা করি সেটাকে ‘রিপ্রোডিউস’ করতে। যারা আমার পূর্বসূরি, তাদের লেখা থেকে চুরি করি। সেই অর্থে আমাকে ডাকাত বলতে পারো।

অনেকেই আমার ‘প্যানিক স্প্রিং’ বইটির খুব প্রশংসা করেন। আসলে ওই বইটা একটা সংকলন। ‘হাক্সলি’ থেকে নিয়েছি পাঁচ পাতা, ‘এডিংটন’ থেকে তিন, ‘রবার্ট গ্রেভস’ থেকে দুই, এভাবে অনেকের থেকে...যাদের কাজ আমার ভালো লাগে। কিন্তু তারা আমাকে প্রভাবিত করতে পারে না। আমি শুধু ‘এফেক্টটা’ শিখে নিই।

আবার প্রশ্ন

-আপনি খুব সচেতনভাবে আপনার লেখার স্টাইল তৈরি করছেন?

-কেউ কি সচেতনভাবে ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখতে পারে? ‘ডু ইউ কনশাসলি ড্রিম? স্বপ্নের ব্যাপারটা কীভাবে যে ঘটে কেউ জানে না। ‘স্টাইল’ হচ্ছে একটা স্বপ্নময় ব্যাপার। নিরন্তর অনুশীলন করতে করতে স্টাইল আপনা থেকেই তৈরি হয়।

ডায়েলের কথা বলার ধরনই এ রকম, ছলাকলাহীন। কেমব্রিজে পড়তে চেয়েছিলেন তিনি। সেখান থেকে প্রত্যাখ্যাত হন। একসময় নাইট ক্লাবে পিয়ানো বাজাতেন। এস্টেটের এজেন্ট হিসেবে ভাড়া আদায়ের কাজও করেছেন। আবার পুলিশে কাজ করেছেন কিছুদিন।

একবার সুইজারল্যান্ড যাবার পথে এক ঝলকের জন্য প্যারিস দেখতে পান। ফেরার পথে দিন তিনেক সেখানে কাটান। এভাবেই প্যারিসের প্রেমে পড়ে সেখানে থেকে যান।

ডায়েলের ইন্টারভিউটা পড়বার পর নতুন করে অনুপ্রাণিত হই। মনে হয়, একজন কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকারের কাজ হওয়া উচিত শুধুই লিখে যাওয়া। একজন শিল্পীর, চিত্রকরের কাজ হওয়া উচিত শুধুই এঁকে যাওয়া।