‘দ্য রিভার’ খ্যাত জঁ রেনোয়া

বাঙালিরা বরাবরই নদীর সঙ্গে সুপরিচিত। যদিও ব্রহ্মপুত্র, কপোতাক্ষ দু-একটি নদ আছে। নদী স্ত্রীলিঙ্গ তাই আমরা নদীমাতৃক বলি। আর নদ পুরুষ লিঙ্গ। যদিও নদের আধিক্য কম তবু আমরা নদ-নদী বলি। নদকে সামনে নিয়ে আসি নর-নারীর মতো। পুরুষবাদিতা নদীকেও পিছু ছাড়েনি। যা হোক নদীর চরিত্র শান্ত, সৌম্য ও হিংস্র। বহমান নদী প্রায় সিক্ত করে আমাদের বাংলার মৃত্তিকা। তবে মাঝেমধ্যে সেই নদী ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়ে নিজের জায়গা আয়তনে বৃদ্ধি করে অন্যের জমি-জায়গা কেড়ে নিয়ে আবার আকস্মিক অন্য কোথাও চর উপহার দিয়ে ঋণ পরিশোধ করে। উল্লেখ্য, নদী নিয়ে ঋত্বিক ঘটকের একটি বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। এই ছবিতে নদীর পাড়ে জেলেদের বসবাস এবং তাদের জীবনচরিত দৃশ্যমান। সেই তিতাসই একসময় নিজের অস্তিত্বকে আত্মাহুতি দিয়ে অন্য একটি রূপ ধারণ করে, কেন জানি নিজেকে রোদে শুকিয়ে বালুময় করে তোলে কালজয়ী সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র উপন্যাস অবলম্বনে গৌতম ঘোষ পরিচালিত চলচ্চিত্রেও আমরা নদীভিত্তিক জীবনাচারের এক মহাকাব্যিক আখ্যান প্রত্যক্ষ করি।

এদিকে The river চলচ্চিত্রে অন্য প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন পরিচালক আমাদের অবিভক্ত ভারতের সংস্কৃতি দর্শন, ধর্ম ও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সময়ের ইংরেজ পরিবার গঙ্গার বাঁকে বসবাস। তাতে অনেক বৈচিত্র্যময় বিষয়বস্তুর চিত্রায়ণ দেখতে পাওয়া যায়। এই ছবির পরিচালক হচ্ছেন ইমপ্রেশনিজমের বিদগ্ধ চিত্রশিল্পী অগাস্ট রেনোয়ার দ্বিতীয় সন্তান জঁ রেনোয়া। তিনি একাধারে ফরাসি চলচ্চিত্র পরিচালক, অভিনেতা ও লেখক ছিলেন।

জন্ম ১৫ সেপ্টেম্বর ১৮৯৪ সালে প্যারিসের ছোট একটি জেলা মোর্মাত (Montmartre)-এ জন্মগ্রহণ করেন। এই জায়গা খুবই প্রসিদ্ধ কারণ হচ্ছে এখানে ইমপ্রেশনিস্ট গ্রুপের অনেক শিল্পী বসবাস করতেন। উপরন্তু না বললেই নয় তাঁর জন্ম শতভাগ সার্থক এই জন্য যে রেনোয়া যখন পৃথিবীতে এসে চোখের ব্যবহার শুরু করেন, দেখতে পান বিভিন্ন রংতুলি, ক্যানভাস ও শিল্পী, যেন শিল্পিত ভুবনে ফুলের তোড়া নিয়ে অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন শিল্পকলার নানা অনুষঙ্গ। শিল্পতাত্ত্বিক হারবার্ট রিডের ভাষায় শিল্পবোধের ক্ষেত্রে দুটি জিনিসের প্রয়োজন হয় যেমনÑ পারসেপশন এবং এক্সপ্রেশন। আর জঁ রেনোয়া দুটি জিনিসের উত্তরাধিকারসূত্রে মালিকানাধীন, তাই মায়ের পেট থেকে ছাড়পত্র পেয়ে আসার সময় Perception এবং Expression নিয়ে আসেন পৃথিবীতে।

শিল্পীরা স্বাধীন, তবে জঁ রেনোয়ার প্রথম জীবন শুরু হয় পাথরের দেয়ালঘেরা বন্দিনিবাস দিয়ে। বাবার আর্থিক সচ্ছলতার কারণে কেতাদুরস্ত বোর্ডিং স্কুলে পড়াশোনা করত। প্রায় সময় সে পালিয়ে বেড়ানো তার স্বভাবে পরিণত হলো।

যেমন একটি ছোট্ট ঘটনার বিবরণ দিচ্ছি। একদিন স্কুলের নোটিশ বোর্ডে লিখে দিয়েছে, প্রতিটি ছাত্রকে চুল ছোট করতে হবে। এই খবর শোনামাত্র নিমেষেই স্কুলত্যাগ।

সত্যিকারে বড় চুল ছেলেদের নাকি মেয়েদের? আমি যতটুকু জানি সবাই একসময় বড় চুল রাখত, কোনো এক যুদ্ধে রোমান সৈন্যরা পরাজিত হলো, কারণ বড় চুলের টানাহেঁচড়ায়। তখন রোমানরা এমন একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে সব সৈন্যকে চুল ছোট করতে হবে। সম্ভবত ওই সময় থেকে ছোট চুলের প্রচলন। আমার লেখায় সংযুক্ত চিত্রে তাঁর বাবা অগাস্ট রেনোয়া তাঁকে ছোটবেলায় মডেল হিসেবে এঁকেছেন, একটি পরিচারিকার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে শিশু জঁ রেনোয়া। শিশুকালে রেনোয়া বাবার খুবই প্রিয় মডেল ছিল এমনকি পরিবারের সবাই তাঁর বাবাকে মডেল দিয়ে শিল্পের উপজীব্য হতো।

সদ্য তরুণ জঁ রেনোয়া নিজের জীবনযুদ্ধের যোদ্ধা হওয়ার প্রাক্কালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি ফরাসি অশ্বারোহী সৈনিক থাকাকালীন পায়ে গুলিবিদ্ধ হলে স্থায়ীভাবে খোঁড়া হয়ে যান। তবু সেই আঘাত তাঁর গতিরোধ করতে পারেনি। যুদ্ধের পর তিনি অতি সাধারণ জীবনযাপন শুরু করেন। তাঁর কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল না। আসলে পরিকল্পনার সঙ্গে শিল্পের সংঘাত আছে। শিল্প হচ্ছে নিরীক্ষা আর পরিকল্পনা হচ্ছে অঙ্কের হিসাব বা পরোক্ষ ফল। ওই সময় তিনি মৃৎশিল্পের কাজ শুরু করেন এবং ঠিক এক সপ্তাহের মাথায় তাঁর বাবার জীবনপ্রদীপ নিভে যায় চিরতরে। তিনি চার বছর মৃৎশিল্পের কাজ করেছিলেন। ঘটনাচক্রে চলচ্চিত্র নির্মাণে সচেষ্ট হন। তবে এর পেছনে যাদের ছবি তাকে অনুপ্রাণিত করেছিল যেমন গ্রিফিথ, চ্যাপলিন, রাশিয়ার অভিনেতা মোঝুখিন অভিনীত ছবি এবং সর্বোপরি স্ট্রোহাইমের ফুলিশ ওয়াইভস ছবিটি দেখে।

১৯২৪ সালে ছবি বানানো শুরু করেন। তাঁর নয়টি নির্বাক চলচ্চিত্রের অভিনেত্রী হিসেবে যিনি ছিলেন ক্যাথরিন হ্যাসেলিং, তিনি হচ্ছেন জঁ রেনোয়ার পতœী। ক্যাথরিন হ্যাসেলিং ছিলেন তাঁর বাবা অগাস্ট রেনোয়ার শিল্পকর্মের মডেল। প্রসঙ্গক্রমে তাঁর মা এলিন চারিগটা; তিনিও একসময় তাঁর বাবার মডেল ছিলেন বিয়ের আগে। তাতে প্রতীয়মান হয় যে বাবা-ছেলে মডেলকে শুধু শিল্পকর্মের ফ্রেমবন্দী করেনি, সঙ্গে জীবনবন্দীও করেছেন।

জঁ-এর প্রথম দিকের ছবি সফলতার মুখ দেখেনি, তাতে প্রযোজকদের টাকা পরিশোধ করতে বাবার পেইন্টিং বিক্রি করতে হয়েছে। সাময়িক অর্থনৈতিক বাধা তাকে রুদ্ধ করতে পারেনি। পরে অবশ্য পুরোদমে কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ চল্লিশ বছরের বেশি সময় ধরে পঁয়ত্রিশটির মতো ছবি পরিচালনা করেন। তাঁর ত্রিশের দশকের বিভিন্ন ছবিতে ইম্প্রেশনিজম ও ন্যাচারালিজমের প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়।

১৯৪৯ সালে The river ছবির লোকেশন খুঁজতে সুদূর ফ্রান্স থেকে কলকাতায় আসেন। ছবিটির গল্প বা চিত্রনাট্য এখানকার, তাই ‘অভিনেতা অভিনেত্রী আবশ্যক’ স্টেটম্যান পত্রিকায় এই বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। সত্যজিতের নজরে পড়ে এই খবর, তিনি যদিও পূর্বে তাঁর অনেক ছবি দেখেছেন। জঁ রেনোয়ার চলচ্চিত্রের প্রতিভা সম্বন্ধেও আগে থেকে জানা ছিল। The river ছবিতে অভিনেতা-অভিনেত্রী ছাড়া যেসব কলাকুশলী কাজ করেছেনÑ হরিসাধন দাশগুপ্ত (সহকারী), রামানন্দ সেনগুপ্ত (ক্যামেরাম্যান) এবং বংশীচন্দ্র গুপ্ত (শিল্প নির্দেশক), সুব্রত মিত্র। উল্লেখ্য, সুব্রত মিত্র হচ্ছে পথের পাঁচালীর ক্যামেরাম্যান বা চিত্রগ্রাহক। The River ছবিতে কাজ করে তাঁর অভিজ্ঞতা সঞ্চয়, সুতরাং সে অভিজ্ঞতার সঞ্চালন পথের পাঁচালীতে। জঁ রেনোয়ার জীবনের প্রথম রঙিন ছবি The River। সত্যজিতের বর্ণনানুসারে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে জঁ রেনোয়ার সঙ্গে লোকেশন অনুসন্ধানে বেরিয়ে যেতাম আমি নানা প্রশ্ন করতাম তাকে। আলোচনার ফাঁকে দেখতাম। দেখার চোখ কতভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে জঁ রেনোয়াকে। দেখতেন কলকাতার মাঠঘাট, দোচালা কুঁড়েঘর, কচুরিপানা, বাঁশঝাড়, কলাগাছ এবং এখানকার সাধারণ মানুষের অসাধারণ শিল্পবৈশিষ্ট্য। যেন ক্যামেরা মাটিতে ফেলে রাখলে ছবির কম্পোজিশন স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়ে যায়। জঁ রেনোয়া প্রায় বলতেন আদিযুগের সরলতা ও সৌন্দর্য এখনো ভারতে কিছুটা আছে। এই প্রাণপ্রতিম মানুষটি ছবির লোকেশন খুঁজতে এমনকি নারায়ণগঞ্জে চলে এসেছিলেন, তবে ছবির শুটিং হয়েছে কি না মতানৈক্য আছে।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট মিতেবাঁরের হাত থেকে লিজিয়ন অব অনার নেওয়ার সময় ও সত্যজিৎ অকুণ্ঠচিত্তে স্বীকার করেন, জঁ রেনোয়া হচ্ছেন আমার গুরু।

রেনোয়ার বিখ্যাত ছবি The Bitch, Tone The Illussion, The Rules of the Game, The Southerener, The golden Coach প্রভৃতি।

উল্লেখযোগ্য রচিত গ্রন্থ: Renoir-My Father, My life and My films প্রভৃতি।

তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ নানা পুরস্কারে ভূষিত হন। তন্মধ্যে অস্কার ও স্বদেশ থেকে লিজিয়ন অব অনার অন্যতম।

১৯৭৯ সালে ৮৪ বছর বয়সে আমেরিকাতে এই মহান মানুষটির প্রয়াণ ঘটে। রেখে গেছেন অনন্য শিল্পকৃতি। বাবা-ছেলের দারুণ রূপান্তর একজন স্থিরচিত্রী, অন্যজন চলচ্চিত্রী। স্থিরচিত্রের উত্তরসূরি চলচ্চিত্র।

তথ্যসূত্রে:
সত্যজিৎ রায়- বাবুল ভট্টাচার্য
চলচ্চিত্রের অভিধান- ধীমানদাশ গুপ্ত
The River- Movie
www.filmsdfrance.com
Wikipedia (Jean Renoir)