জীবনের ভ্রমণ উপাখ্যান

অ্যারিজোনা, যুক্তরাষ্ট্র

শিল্পী শিল্প তৈরি করেন। কিন্তু কখনো কখনো শিল্পীর ভাব, জীবনবোধ ও জীবনমাত্রাই রূপ নেয় এক অনন্য শিল্পে। রং আর টেক্সচারের বৈচিত্র্য তৈরি হয় শিল্পীর মনোজগতের গভীরতর স্মৃতি আর বাস্তবতার মেলবন্ধনে। ভাষা, চিত্রকর্ম আর ব্যক্তিজীবন এমন এক সূত্রে বাঁধা পড়ে যে, শিল্প হয়ে ওঠে শিল্পী নিজেই। রফি হক, আমার দীর্ঘদিনের চেনা এই শিল্পীকে আমার একটি অনবদ্য শিল্পই মনে হয় তাঁর জীবনের ভ্রমণ উপাখ্যান, বোধের গভীর থেকে উঠে আসা ভাষাগত ভাব আর চিত্র নির্মাণের প্রক্রিয়া পুরোটা মিলেই শিল্পী - আমার চোখে এক শিল্প রফি হক।

একুশ বছরের বেশি সময় ধরে কাছ থেকে, দূর থেকে দেখে এসেছি রফি হকের শিল্পচর্চার পথ পরিক্রমা। ব্যক্তি মানুষটির সঙ্গে আর তাঁর চিত্রকর্মের মাঝে রয়েছে এক স্বচ্ছ সততার মেলবন্ধন। রফি হকের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানতে পারি, তিনি স্মৃতি নিয়ে ছবি আঁকেন। সময়ের গতিপ্রবাহে প্রতিটি মুহূর্ত অতিক্রান্ত হওয়া মাত্রই তা অতীত হয়ে যায়। আর সে সময়ের অভিজ্ঞতাগুলো স্মৃতি হিসেবে জমা হয় তাঁর চিন্তার সীমারেখায়। ছবি আঁকার অনুপ্রেরণা কিংবা অনুষঙ্গ উনি খুঁজে পান সেই সব স্মৃতির ভান্ডার হাতড়ে ফিরে। এই প্রাসঙ্গিক কারণেই শিল্পী রফি হক জার্নাল লেখেন নিয়মিত। লেখার অভ্যাসটি তাঁর স্বভাবগত। ধীরে ধীরে এই ভাষার চর্চা আর চিত্রকর্মের চর্চা - দুটোই একে অন্যের পরিপূরক হয়ে উঠেছে শিল্পী রফি হকের শিল্পমাত্রায়। তাই তাঁর চিত্রকর্মে অহরহ ভাষার ছড়াছড়ি যেমন চোখে পড়ে, তেমনি তাঁর হাতে লেখা জার্নালে ছবির রং, রেখার বিন্যাসে জার্নালের পাতাটিও আর এক মাত্রার শিল্প হয়ে ওঠে।

সম্প্রতি রফি হকের শিল্প প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় দ্য ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোতে। মরুর শহর থেকে ছুটে গিয়েছিলাম ঠান্ডা হাওয়ার শিকাগো শহরে। আমেরিকায় এসেছেন স্বদেশি শিল্পী, যাঁর চিত্রকর্ম শুধু বাংলাদেশের চিত্রকলার প্রাচুর্য প্রকাশ করে তা নয়, সেখানে রয়েছে গ্লোবাল বিশ্বের একটি স্বাদ। বাংলাদেশের সংস্কৃতি উচ্চকিত তাঁর কর্মে। কিছু চিত্রকর্মের শিল্পগত মান, পারদর্শিতা আর উপস্থাপনের কারিশমায় তাঁকে কোনো ভৌগোলিক সীমানায় আটকে ফেলা যায় না। এর যথাযথ প্রমাণও মিলছে অহরহ। শিল্পী রফি হক আমেরিকার শিল্পজগতে শুধু এবার নয়, এর আগেও তাঁর কাজ উপস্থাপন করেছেন। ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলোতেও ব্যাপকভাবে স্বীকৃতি ও সম্মান, সেই সঙ্গে বড় হলো, দর্শক সমাদর পেয়েছেন।

শিকাগো শহরে শিল্পী রফি হকের কাজ এবং তাঁর শিল্পবিষয়ক ভাবনা নিয়ে কথা বলার সুযোগ নিয়েছি অনেকটাই। আমাকে বরাবর বিস্মিত করে তাঁর কাজের প্রতি নিষ্ঠা ও পুরো প্রক্রিয়াটির প্রতি গভীর বিচক্ষণ দৃষ্টিভঙ্গি। দেখতে পেলাম শিল্পী নিজে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হতে চান না, বরং তাঁর চিত্রকর্মকে দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন তাঁর সমস্ত ভাবপ্রকাশের মাধ্যম হিসেবে।

বাংলাদেশের চিত্রকলায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার্থী হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা হলো, সেখানে একাডেমিক জ্ঞানার্জন, সহজ কথায় আর্টবিষয়ক পড়াশোনার প্রতি একটি বিমুখ ভাব বিরাজ করত। কারিগরি দক্ষতাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হতো। অবশ্যই অনেক শিল্পশিক্ষার্থী এবং শিল্পী এই ধারার বাইরে এসে নিজেকে সমকালীন করতে পেরেছেন। শিল্পী রফি হকের সঙ্গে যাঁরা ব্যক্তিগত আলাপের সুযোগ পেয়েছেন, তাঁরা আমার সঙ্গে একমত হবেন, শিল্পজ্ঞান, ইতিহাস ও শিল্পধারার তাঁর পা-িত্য অগাধ। সময়ের প্রেক্ষাপটে তাই তাঁর শিল্পচর্চা কখনোই ওল্ড ফ্যাশনড হয়ে যায়নি। ক্রমাগত রং, ফর্ম, টেকনিক, ভাব, স্টাইল - সবকিছুই আন্তর্জাতিক শিল্পগতির সঙ্গে সমান তালে এগিয়ে চলে। হয়তো এ কারণেই যেকোনো দেশের ভৌগোলিক গ-িতেই তাঁর চিত্রকর্ম খুব সহজেই সেখানকার দর্শকের সঙ্গে মেলবন্ধন তৈরি করে সহজেই।

শিল্পী রফি হকের চিত্রকর্ম মূলত বিমূর্ত ধারায় উপস্থাপিত। বিমূর্ত কথাটির সঙ্গে সহজবোধ্য নয় এমন একটি ধারণা খুব সম্পৃক্ত। কিন্তু রফি হকের বিমূর্ততার মাঝে বিশেষভাবে প্রতীয়মান। যেকোনো শিল্পরসিক কিংবা সাধারণ দর্শকের ভাবনা, আবেগগত আর মননে খুব সহজেই একটি যোগসূত্র তৈরি করতে পারে। শিল্পের ভাষাগত জটিলতাকে খুব অনবদ্যভাবে তিনি একটি সর্বজনীন বোধগম্য ভাষায় প্রকাশ করেন।

তাঁর কাজে বিভিন্ন ফর্ম ও এলিমেন্টসের প্রয়োগ দেখা যায়। তাঁর সঙ্গে শিকাগো শহরের পথে হাঁটতে হাঁটতে দেখেছি। কত ক্ষুদ্র কিংবা অনুল্লেখিত বিষয়বস্তুর প্রতি অগাধ আগ্রহ নিয়ে দেখছেন, ছবি তুলছেন কিংবা প্রশংসা করতে গিয়ে কোনো এক শিল্পীর চিত্রকর্মের উদাহরণ দিচ্ছেন। মানুষ, অভিজ্ঞতা, ঘটনা, স্মৃতির পাশাপাশি পরিবেশগত এসব এলিমেন্ট তাঁর মাঝে প্রচুর প্রভাব ফেলে। তাই হয়তো তাঁর কাজে ক্রমাগত নতুন ধরনের রং ও কর্মের প্রয়োগ খুঁজে পাওয়া যায় প্রচ্ছন্নভাবে। চিত্রশিল্পী রফি হক শিকাগোতে এসেছেন বাংলাদেশে শিল্পকলার অবস্থান এবং রূপরেখা উপস্থাপন করার গুরুভার নিয়ে। তাঁর সঙ্গে এবং ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর লেকচারার মন্দিরা ভাদুরির সঙ্গে এখানকার সাউথ এশিয়ান ল্যাগুয়েজ অ্যান্ড কালচারস অনুষদের বিভিন্ন বর্ষের ক্লাসে যাবার সুযোগ হয়েছিল। খুব অভিভূত হলাম দেখে যে ফরাসি প্রফেসর কিংবা ফকেশিয়ান শিক্ষার্থীর মুখে অনর্গল বাংলা ভাষা শুনে এবং বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ও শিল্পের প্রতি অগাধ কৌতূহল দেখে। শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করেছিল বাংলাদেশের চিত্রকলায় রাজনৈতিক প্রভাব, বাস্তবধর্মী এবং বিমূর্ত চিত্রকলার ধারা, সামাজিক প্রভাব, ট্রাইবাল আর্ট, আন্তর্জাতিক মান, শিল্পবাজার স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী ও পরবর্তী শিল্পগতি, বাংলাদেশি শিল্পকলার বিকাশ এবং ক্রমাগতি - এ ধরনের বহু প্রসঙ্গ। শিল্পী রফি হক খুব বিচক্ষণতার সঙ্গে বহুবিধ বাংলাদেশি আর্টবিষয়ক বই এবং সøাইড প্রদর্শন করে চমৎকার সব উত্তর দেন। প্রসঙ্গক্রমে তিনি উল্লেখ করেন বাংলাদেশের প্রয়াত, প্রবীণ শতাধিক শিল্পীর নাম এবং তাঁদের অবদান। সহজ কথায় বলতে পারি, বাংলাদেশের এহেন শিল্পী নেই যাঁদের কাজ নিয়ে উনি কথা বলতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়েছেন।

বাংলাদেশের চিত্রকলা: প্রবণতা ও স্বরূপসন্ধানবিষয়ক একটি লেকচার - পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে সফল উপস্থাপনা করেন তিনি ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর বিভিন্ন অনুষদের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় শিল্পভাবুকদের সামনে।

শুরুতেই বলেছি, শিল্পী রফি হক আমার চোখে একটি শিল্প। দুর্দান্ত ঠান্ডা হাওয়ার শহর ছেড়ে ফিরে যাচ্ছি মরু হাওয়া, ক্যাকটাস আর লাল পাহাড়ের জায়গা অ্যারিজোনাতে। এই সফরে যা সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি তা হলো এক আকাশ শিল্প অহংকার। বাংলাদেশের শিকড়প্রসূত একজন শিল্পীর বিশ্বের দরবারে জায়গা করে নেবার অনুপ্রেরণা আর আত্মবিশ্বাস শিল্প এবং শিল্পী রফি হকের কাজ, তাঁর পা-িত্য এবং সততার সঙ্গে বাংলাদেশের শিল্পধারার উপস্থাপন খুব কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতাটি আমার নিজস্ব শিল্প ভ্রমণের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে থাকবে।