চিত্রকলা, দর্শক এবং সংযোগ

চিত্রকলার ক্ষেত্রে কমিউনিকেশন বা সংযোগ স্থাপনের বিষয়টি অনেক সময় বুদ্ধিজীবীদের আলোচনাচক্রে ঘুরেফিরে উত্থাপিত হয়। মধ্যবিত্ত শিল্পরসিকেরাও প্রদর্শনীকক্ষে এসে উষ্মা প্রকাশ করেন। কোনো একটি ছবি দেখে তিনি বলেন, ‘কিছুই বুঝতে পারছি না।’ শিল্পী যে ছবির মধ্যে কী বলতে চাইছেন তা তাঁর কাছে অস্পষ্ট। ছবিটি তাঁর কাছে কিছুই কমিউনিকেট করছে না।

অথবা অভিযোগ করা হয়, সাধারণ মানুষের সঙ্গে শিল্পীর কোনো যোগাযোগ নেই। শিল্পী বিচরণ করেন তাঁর সুউচ্চ মিনারে। দৈনন্দিন জীবন ও মাটি থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন। কাল্পনিক জগৎ নিয়ে তিনি থাকেন। রং, রেখা, আলো-ছায়ার মধ্যে তিনি মগ্ন। সৌন্দর্যতত্ত্বের মধ্যে তিনি ভেসে বেড়ান। অথবা কথা ওঠে, গ্রামের মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষ আজকালকার চিত্রকলার কিছুই বুঝতে পারছে না। তাই কথা উঠতে পারে এমন শিল্পকলার প্রয়োজনই-বা কী? এসব প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে। তাই চিত্রকলা, দর্শক ও কমিউনিকেশনের বিষয়টি নিশ্চয়ই বিশেষভাবে আলোচনাসাপেক্ষ।

এবার খতিয়ে দেখা যাক, চিত্রকলার ক্ষেত্রে কমিউনিকেশন ব্যাপারটি কী? কার সঙ্গেই বা কমিউনিকেশন? ধরা যাক, কমিউনিকেশন চিত্রশিল্পের সঙ্গে দর্শকের। দর্শক বলতে বুঝি জনসাধারণ, যার মধ্যে রয়েছে ধনী ব্যবসায়ী, মধ্যবিত্ত কেরানি, খেটে খাওয়া মজুর, চাষি, ছাত্র-শিক্ষক, কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী সবাই। ছবি ও দর্শকের মধ্যে যোগাযোগ ঘটাবার মূল কারণটি কিন্তু নির্ভর করছে দুই পক্ষের আন্তরিকতা ও সততার ওপর। অর্থাৎ সার্থক শিল্পসৃষ্টি এবং সুশিক্ষিত অনুভূতিশীল দর্শক, এই দুই এক হলে স্বভাবতই যোগাযোগের কোনো বাধা থাকে না। কিন্তু এর কোনো একটিতে ঘাটতি থাকলেই সমস্যা দেখা দেবে। অর্থাৎ চিত্রটি যদি অসার্থক হয় কিংবা দর্শক যদি শিল্পবোধহীন হয়ে অক্ষম হন, তাহলে যোগাযোগের সূত্রটি কখনোই গড়ে উঠবে না। যুক্তি হিসেবে এ কথা সম্পূর্ণ সত্য। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি বেশ জটিল। কারণ, চিত্রকরের আঁকা ছবিটি সার্থক কি না, তা অনেক ক্ষেত্রেই দর্শক এমনকি শিল্পীর কাছেও অজানা রয়ে যায়। এবং যিনি দর্শক তিনি কার্যত অনেক সময় স্বীকার করেন না যে তিনি ছবিটি বুঝতে বা তার রস গ্রহণে অক্ষম বা তাঁর ক্ষমতা সীমিত। ফলে একটি অসার্থক বা সার্থক ছবির সামনে একজন সক্ষম বা অক্ষম দর্শক, এমন আমরা প্রায়ই দেখি। ছবি ও দর্শকের যোগাযোগের সমস্যাটি এখানেই। কিন্তু কেন এমন হবে?

আমরা জানি, ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি।’ তেমনি যাঁরা ছবি আঁকেন, সুদৃশ্য ফোল্ডার ছেপে প্রদর্শনী করেন, পুরস্কার পান, ছবি বিক্রি করেন, তাঁরা সবাই ‘শিল্পী’ নন। হয়তো চিত্রকরদের অলিখিত স্তর ভেদ করা যায়। তাই আধুনিক চিত্রকরদের জগতে কেউ বিনোদবিহারী, কেউ হোসেন, কেউ পি টি রেড্ডি এবং কেউ বি প্রভা। দর্শকদের মধ্যেও এমনি স্তর ভেদ রয়েছে। কেউ বিনোদবিহারীর ছবি ভালোবাসেন। কেউ পছন্দ করেন হোসেনের, কেউ পি টি রেড্ডির এবং অনেকে বি প্রভার। বি প্রভা শিল্পী হিসেবে হয়তো অসার্থক, কিন্তু এক শ্রেণির মানুষের কাছে তিনি যথেষ্ট জনপ্রিয়। অনেকেই তাঁর ছবি বুঝতে পারেন। তাঁর ছবি দিয়ে ঘর সাজান। পাঞ্জাবের সব থেকে পরিচিত শিল্পী অমৃতা শেরগিল নয়, শোভা সিং। সিনেমার ক্ষেত্রে কী ঘটছে? সারা ভারতবর্ষের গ্রামে, গঞ্জে, শহরে, অজপাড়াগাঁয়ে সাধারণ মানুষের অধিকাংশের প্রিয় হল বম্বে ফিল্ম এবং ফিল্মি সংগীত, যদিও তার শিল্পমূল্য অনেক ক্ষেত্রেই শূন্য। চিত্রকর এবং ছবির ক্ষেত্রেও এর অন্যথা হবার নয়। তাই লোকপ্রিয়তার সঙ্গে শিল্পসৃষ্টির মানের কোনো সম্পর্ক নেই এবং শিল্পবিচারের মানদ- ‘লোকপ্রিয়তা’ নয়। এ সত্য সম্ভবত আজ কারোর অজানা নয় কিন্তু এর সঙ্গে আর একটি সত্যও প্রকাশিত হচ্ছে নাকি যে, দেশের অধিকাংশ মানুষই খুব নিচু মানের ফিল্ম, ছবি, গান ভালোবাসেন? এ সত্যকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না। অবশ্য এই পরিস্থিতির পেছনে অনেক গভীর সামাজিক কারণ রয়েছে। কিন্তু একটি মৌলিক বিষয় সম্পর্কে আমাদের ওয়াকিবহাল হওয়া প্রয়োজন। বিষয়টি হলো মানুষের সহজাত ক্ষমতা এবং শিল্পবোধ।

জনসংখ্যার বড় অংশটি হলো মাঝারি শ্রেণির। তাঁরা যদিও বেশ বুদ্ধিমান, চালাক এবং করিৎকর্মা, কিন্তু তাঁদের মানসিক ক্ষমতা প্রতিভাশালীদের মতো সূক্ষ্মবোধসম্পন্ন নয়। শিল্প-সাহিত্য-সংগীতের গভীরতর দিকগুলো তাঁদের কাছে অস্পষ্ট রয়ে যায়, তবে তার পপুলার ফর্ম, এক্সপ্রেশনকে তাঁরা বেশ বুঝতে পারেন, তা থেকে আনন্দ পান। সুশিক্ষা পেলে তাঁরা উঁচু মানের শিল্পকলার প্রশংসা করতে পারেন এবং সামাজিকভাবে তাঁরা ‘সংস্কৃতিমনস্ক’ হতে পারেন। তাঁদের ক্ষমতা যেহেতু সীমিত, তাই উঁচু মানের শিল্পভাবনার গভীরে তাঁরা আন্তরিকভাবে প্রবেশ করতে পারেন না। সূক্ষ্ম সৌন্দর্যবোধের অভাবে তাঁরা বুঝতে ভুল করেন। ধরা যাক, তাঁরা সমগ্র জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ। অর্থাৎ তাঁরাই দলে ভারী এবং কার্যত সবকিছুর পপুলারিটি তাঁরাই সৃষ্টি করেন। সমস্ত কিছুর ‘ফ্যাশন’ তাঁরাই বজায় রাখেন। সুতরাং সমাজের তাঁদের ভূমিকা সর্বক্ষেত্রেই বেশ জোরালো। সমাজের মূল চরিত্রটি তাঁরাই গড়ে তোলেন। এ ব্যাপারটি শুধু অনুন্নত ভারতবর্ষ নয়, ইউরোপ, আমেরিকার মতো উন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রেও সত্য। তবে সৃষ্টিশীল পরিবর্তন যা কিছু হচ্ছে, তার হোতা হচ্ছেন ওপরের স্তরের ৩০%, কিংবা ৫% সৃষ্টিশীল মানুষ! এ ব্যাপারটি সব দেশকালেই সত্যি।

এবার আসি চিত্রশিল্পীদের কথায়। চিত্রকরেরাও জনসাধারণের সকল স্তর থেকে আসেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি ছোট অংশই সার্থক শিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারার ক্ষমতা রাখেন বা তাঁদের সে প্রতিভা রয়েছে। প্রকৃতপক্ষেই তাঁরা উপযুক্ত। ধরা যাক, সমস্ত বাংলাদেশে যদি পাঁচ শ চিত্রকর থাকেন তবে তাঁদের মধ্যে প্রতিভাশালী চিত্রকরের সংখ্যা হবে মাত্র ২৫ জন বা ৫ জন। বাকি অধিকাংশ চিত্রকরই তাঁদের অক্ষমতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকেন না। তাঁদের সৃষ্টিকর্মও নানা কারণে উঁচু মানের শিল্পকলা হয়ে ওঠে না, যদিও কখনো কখনো তা আপাতদৃষ্টিতে আকর্ষণীয় মনে হতে পারে এবং বেশ পপুলার হতে পারে; কারণ দর্শকশ্রেণির একটি বড় অংশ সেই সব শিল্পকলার সমঝদার। মোট কথা, শিল্পীদের সামান্য একটি অংশ যেমন সার্থক শিল্পসৃষ্টিতে সক্ষম হন তেমনি দর্শক বা জনসাধারণের সামান্য একটি অংশই প্রকৃতপক্ষে শিল্পকলার রসাস্বাদনে সমর্থ হন। কথা উঠতে পারে, সাধারণ মানুষ কি শিক্ষার মধ্য দিয়ে শিল্পবোধ অর্জন করতে পারেন না? আমরা জানি, একজন শিল্পী যেমন প্রতিভা নিয়ে জন্মায়, তেমনি সাধারণ মানুষও কমবেশি সহজাত শিল্পবোধ নিয়ে জন্মায়। শিক্ষা ও পরিবেশ তার প্রস্ফুটন ঘটাতে সাহায্য করে মাত্র। যেমন একজন গ্রামের মানুষ, ধরা যাক, একজন চাষি, তার মধ্যে বড় চিত্রশিল্পীর মৌলিক সব গুণ থাকতে পারে সুপ্ত অবস্থায়। কিন্তু সে চাষবাস করে দিন কাটিয়ে গেল। তাই তার প্রতিভার স্ফুরণ কোনো দিনই হলো না। অথচ উপযুক্ত শিক্ষা পেলে সে হয়তো মস্ত শিল্পী হতে পারত। এর উল্টোটাও দেখা গেছে। একজন ব্যক্তি, যিনি কয়েকটি ডিগ্রি নিয়েছেন এবং সারা পৃথিবীর বড় বড় মিউজিয়াম ঘুরে বেড়িয়েছেন, তিনিও কিন্তু প্রতিভা না থাকলে শিল্পী হিসেবে কিছুই করতে না-ও পারেন। দর্শকদের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার ঘটে। গরিব চাষাভুষা মানুষ বা কারখানার শ্রমিক, সবার মধ্যেই সহজাত শিল্পবোধ রয়েছে। অথচ এ দেশে তাঁরা শিল্পকলা বিষয়ে নিয়মমাফিক কোনো শিক্ষা, ইতিহাস চর্চার অভাবে এ বিষয়ে কোনো ধারণা তৈরি করতে পারেন না এবং তাঁরা শিল্পকলার রস গ্রহণে সমর্থ হন না। অন্যদিকে উপাধিধারী অনেক ‘প-িত’ ব্যক্তি আছেন যাঁরা সারা পৃথিবীর তাবৎ শিল্প-ইতিহাস ও শিল্পতত্ত্ব গুলে খেয়েও শিল্পের রসাস্বাদনে অক্ষম। এ থেকেই প্রমাণিত হয়, ব্যাপারটি মূলত সহজাত বা জন্মগত এবং শিক্ষা ও পরিবেশ শুধু ব্যক্তির সুপ্ত সহজাত প্রতিভা ও গুণগুলোকেই প্রকাশ করে মাত্র। সুতরাং জনসাধারণের একটি অংশ যাঁরা শিক্ষাদীক্ষার অভাবে আজ শিল্পসংস্কৃতির রসাস্বাদন থেকে দূরে রয়েছেন, তাঁরা প্রয়োজনীয় শিক্ষার মধ্য দিয়ে নিজেদের সুপ্ত শিল্পবোধকে উন্মোচিত করতে অবশ্যই পারেন।

এবার কমিউনিকেশনের মূল সমস্যায় আবার ফিরে যাওয়া যাক। মনে হয় এখন এর জটিল বিষয়গুলো অনেক সহজ হয়ে আসবে। ধরা যাক, কোনো ছবি দর্শকদের আনন্দ দিচ্ছে না। এর কারণ মাত্র দুটি। এক, শিল্পীর অক্ষমতা। দুই, দর্শকের বুঝবার অক্ষমতা। প্রায়শই প্রদর্শনী কক্ষে এমন প্রশ্ন করা হয়, ‘ছবিটি একটু বুঝিয়ে দিন, কিছুই বুঝতে পারছি না।’ ছবিটি সার্থক শিল্পকর্ম হওয়া সত্ত্বেও যখন দর্শক এমন প্রশ্ন করেন, তখন একথা নিশ্চিত করে বলা যায় যে দর্শক তাঁর নিজের দিক দিয়ে কোনো প্রস্তুতি গ্রহণ করেননি বা তিনি বুঝতে অক্ষম। অবশ্য দর্শক তাঁর সীমিত ক্ষমতা নিয়েও নিজের দিক থেকে শিল্পকলার ইতিহাস ইত্যাদি চর্চার মাধ্যমে নিজেকে কিছুটা তৈরি করতে পারেন। ছবির রসাস্বাদনের ব্যাপারটি একই নিয়মে ঘটে। তার ফলে অজন্তার ফ্রেস্কো কিংবা পাবলো পিকাসোর ছবির রসাস্বাদনে মূলত একই রকম শিল্পানুভূতি কাজ করে।

এ কারণেই একটি উঁচু মানের শিল্পকর্মের রসাস্বাদনে সমর্থ হলে অন্য একটি জাতের উঁচু মানের শিল্পকর্মের রসাস্বাদনে খুব একটা অসুবিধা হয় না। তবে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ইতিহাসটুকু অবহেলা করা সম্ভব নয়। এ কারণেই দর্শক তাঁর ক্ষমতা বা অক্ষমতা বা শিল্পানুভূতির পরিমাপ পৃথিবীর যেকোনো বিখ্যাত চিত্রকে সামনে রেখেই করতে পারেন। এতে তাঁর শিল্পচর্চার কাজটাও কিছুটা এগোবে। আজকাল শিল্পকলা-সম্পর্কিত অজস্র দেশি-বিদেশি বই এবং সুন্দর ছাপ ছবির প্রিন্ট বাজারে বিক্রি হয়। একজন উৎসাহী ব্যক্তি তা থেকে প্রয়োজনীয় জ্ঞানটুকু অর্জন করতে পারেন। তাতে কোনো বাধা নেই। তিনি প্রদর্শনী কক্ষে যাবার অনেক আগেই এভাবে নিজেকে তৈরি করতে পারেন। ছবির ভালো লাগা, মন্দ লাগা সম্পর্কেও তিনি যুক্তিসংগত এবং নিজস্ব একটি স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে পারেন। কিন্তু তেমনটি আর হচ্ছে কোথায়? তাই দর্শক তাঁর পরিচিত শিল্পীকে নিয়েই টানাহেঁচড়া করেন। তবে একটি কথা, ছবিটি যদি সত্যই অসার্থক শিল্পকর্ম হয়, দায়িত্বটি এসে পড়ে শিল্পীর ওপর। শিল্পী হয়তো আপ্রাণ চাইছেন তাঁর শিল্পকে সৎ ও সার্থকভাবে সৃষ্টি করতে, যদিও তা নির্ভর করে মূলত শিল্পীর ক্ষমতার ওপর। যা হোক, এ ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন আসতে পারে, ছবিকে সাধারণের বোধগম্য করে সৃষ্টি করা উচিত নয় কি? চিত্র যদি সাধারণ মানুষ বুঝতেই না পারে, তবে তার সার্থকতাই বা কী? প্রকৃতপক্ষে এই শিল্পবোধ বিষয়টি খুব জটিল। প্রাচীনকালের ভারতীয় বা ইউরোপীয় চিত্রকলার কোনোটাই অন্তত বাহ্যিকভাবে, এমন দুর্বোধ্য ছিল না। অজন্তার ছবি, মহাবল্লীপুরমের ভাস্কর্য কিংবা রাজপুত মিনিয়েচার চিত্রমালা, অথবা রেমব্রান্টের প্রতিকৃতি, রুবেন্স, তিশিয়ান, টার্নারের ছবি কিন্তু আধুনিক অর্থে দুর্বোধ্য নয়। আধুনিক শিল্পকলার আপাতদুর্বোধ্যতা শিল্পের আধুনিকতার প্রয়োজনে সৃষ্ট এবং হয়তো ভবিষ্যতে এমন শিল্পকলা সৃষ্টি হবে যখন শিল্পরীতি আবার আপাতদৃষ্টিতে সহজবোধ্য হয়ে উঠবে।

অবশ্য সাম্প্রতিক শিল্পকলার এই দুর্বোধ্যতা ইউরোপে ঐতিহাসিক কারণেই বিভিন্ন শিল্প আন্দোলনের ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়েই সৃষ্টি হয়েছিল। তারই ঢেউ এ দেশের শিল্পকলায় এসেও লেগেছে। আধুনিক শিল্পকলা যখন বিমূর্ত, তখন তা গভীর এবং সূক্ষ্ম। কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল সাধারণ মানুষ বোঝে এবং প্রশংসা করে, রঁদার ভাস্কর্যও কেউ কেউ বোঝেন, মাধুর্য খুব কম লোকই বুঝবে বা তাঁর প্রশংসা করবে। শিল্পবোধ বা রসাস্বাদন ব্যাপারটি তাই অত সহজ নয়। সাধারণ মানুষের অনেকেই ছবি দেখতে এসে যেটা ছবিতে খোঁজেন, তা হলো গাছ-পাথর, ঘরবাড়ি, গরু-মোষ, সুন্দর মুখ ইত্যাদি। এমন কিছু বোধগম্য বস্তু ছবিতে দেখলেই তাঁরা খুশি হন। ভাবেন, ‘বাহ্, ঐ তো বেশ বোঝা যাচ্ছে।’ তিনি গাছপালা মানুষ দেখছেন কিন্তু ‘ছবিটা’ দেখছেন না। কারণ ছবিটা যে কী, সে ধারণা তাঁর হয়নি। এ জন্য রবীন্দ্রনাথের ছবিতে যে দর্শক কিছুই খুঁজে পান না। তাই তাঁর ভালো লাগে না। ভাবেন, শুধু কালি-কলমের আঁকিবুঁকি। একটি সেন্সাস নিয়ে দেখলে এ কথার সত্যতা খুব স্পষ্ট হয়ে যেত।

প্রকৃতপক্ষে আমাদের ঘরের চতুর্দিকে, চলার পথে, প্রকৃতির মধ্যে বিস্ময়ে দেখবার ও অনুভব করবার কত কিছু ছড়িয়ে আছে, কজন মানুষ তা দেখতে সমর্থ হন? কজন সেসব দেখে আনন্দ পান? সম্ভবত খুব নগণ্য তাঁদের সংখ্যা। অতএব সাধারণ মানুষের একটা সীমিত অংশই শিল্পবোধসম্পন্ন হন। এটা চিরকালই সত্য এবং সর্বত্রই তাই। সামাজিক উন্নতি, শিক্ষাদীক্ষার হেরফেরে এর মাত্রা কিছুটা পরিবর্তিত হয় অবশ্যই।

এ ক্ষেত্রে একটি কথা অপ্রাসঙ্গিক নয় মনে করি। সমাজে শিল্পের কদর বাড়া মানে যে শিল্পকলার বোদ্ধার সংখ্যা খুব একটা বাড়ছে এমন না-ও হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে শিল্প তখন ফ্যাশনের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। এই ফ্যাশন অবশ্যই ভালো। তাতে শিল্প সম্পর্কে জানাজানি বেশি লোকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। তাতে আরও বেশি লোক শিল্প সম্পর্কে কৌতূহলী হন। এবং সত্যিকারের অনুভূতিশীল লোক যাঁরা শিল্পকলা নিয়ে কোনো দিনই মাথা ঘামাননি, তাঁরাও তাঁদের চোখ-মন এদিকে ফেরাতে শুরু করেন। প্রকৃতপক্ষে শিল্পসাহিত্য সম্পর্কে সমাজে ফ্যাশন তখনই গড়ে ওঠে যখন সাধারণ মানুষ অর্থাৎ জনসাধারণের অধিকাংশ সংস্কৃতিমনস্ক হয়ে ওঠেন। এই সংস্কৃতিমনস্কতা শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে সাধারণ মানুষের ক্রমাগত ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থেকেই গড়ে ওঠে। ফলে পুরো সমাজে একটি সাংস্কৃতিক আবহাওয়া তৈরি হয়। জনসাধারণ তখন শ্রদ্ধার সঙ্গে বিশ্বাস করেন যে উঁচু দরের শিল্প-সাহিত্য-সংগীত-ফিল্ম আদরের বস্তু, জীবনকে প্রতিনিয়ত সুন্দর করে তাঁরা চান নিজেদের জীবনের সঙ্গে তাকে যুক্ত করতে। এভাবেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সংস্কৃতিমনস্ক সমাজ গড়ে উঠেছে। ইউরোপে যেমন প্যারি, তেমনি ভারতবর্ষে কলকাতা শহরকে সংস্কৃতিমনস্ক শহর বলা যেতে পারে। প্যারিতে প্রায় শতকরা ১০০ জন খবর রাখেন মাতিস বা পিকাসোকে। কলকাতার অধিকাংশ মানুষ জানেন সুচিত্রা মিত্রকে। অবশ্য এই সংস্কৃতিমনস্কতা কিংবা ফ্যাশনের অর্থ এই নয় যে প্রত্যেকে সাধারণ শিল্পসাহিত্য বা সংগীতবোদ্ধা হয়ে ওঠেন। প্রকৃতপক্ষে সম্ভবত কোনো সময়েই শতকরা ৩০%-এর বেশি লোক উঁচু দরের শিল্পসাহিত্যের প্রকৃত রসাস্বাদনে সমর্থ হন না। তাই এই ব্যাপারে আমাদের মনে কোনো ইউটোপিয়াও থাকার কথা নয়।

বড় বড় শিল্পী একথা জানেন। তাঁরা দর্শক ও সমালোচকদের ক্ষমতা সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। এ বিষয়ে তাঁদের কোনো দ্বিধা নেই। তাঁরা ছবি আঁকেন আত্মবিশ্বাসে। নিজের ইচ্ছায়, ভালো লাগা থেকে। নিজের শিক্ষা-দীক্ষা, অভিজ্ঞতা ও খাটুনি থাকে তার পেছনে। সার্থক শিল্পীরা জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ছবি আঁকেন না। তিনি নিজের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান, চিন্তাভাবনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে আত্মমগ্ন হয়ে ছবি আঁকেন মাত্র। দর্শক যে তাঁর ছবি কতটা বুঝবে, প্রাথমিকভাবে সেটা ভাবলে তাঁর পক্ষে সৃষ্টি করা সম্ভব হয় না। তা যদি হতো, তাহলে পিকাসোর মতো বড় শিল্পী ‘দ্য মোয়াজেল দ্য অ্যাঁভিয়ঁ’র মতো ঐতিহাসিক ছবি আঁকতে পারতেন না। কারণ, ওই ছবিটিকে তাঁর শিল্পীবন্ধুরা থেকে শুরু করে সবাই নিন্দা করেছিলেন। তাঁরা বলেছিলেন ‘ছবিটি কিচ্ছু হয়নি।’ অনেকে হতাশ হয়ে বলেছিলেন, ‘পিকাসোর প্রতিভা নষ্ট হয়ে গেছে’ ইত্যাদি। ছবিটি ৩৭ বছর পিকাসোর স্টুডিওতে সবার অলক্ষ্যে পড়ে ছিল। আজ ছবিটি পৃথিবী বিখ্যাত, পিকাসোর সেরা ছবির একটি।

রবীন্দ্রনাথ কি বাঙালি দর্শকের কথা মনে রেখে ছবি এঁকেছিলেন, না আত্মবিশ্বাস ও ভালো লাগা থেকে? অনেকে তাঁর বৃদ্ধ বয়সের ছবি আঁকার নেশা দেখে তার তাৎপর্য বুঝতে পারেননি। ভেবেছিলেন বুড়ো বয়সের ছেলেমানুষি। অথচ আমরা জানি, রবীন্দ্রনাথ ভারতের প্রথম আধুনিক চিত্রশিল্পী। সুতরাং শিল্পীকে মূলত নিজের বিশ্বাস ও স্বাধীনতা নিয়ে শিল্প সৃষ্টি করতে হয়। প্রকৃতপক্ষে দর্শককে উপেক্ষা করার প্রশ্নটি এখানে আসেই না। শিল্পী দর্শককে উপেক্ষাও করেন না। সার্থক শিল্পকাজ দেখার জন্য একদিন সাধারণ মানুষ ভিড় করে আসেন। তা থেকে তাঁদের কাছে নতুনতর শিল্পের এবং জীবনেরও দিগন্ত উন্মোচিত হয়। কারণ শিল্পসৃষ্টির অর্থই চলতি মানদ-ের পরিমাপে নতুনতর, ভিন্ন, বিস্ময়কর কিছু, যা সাধারণ মানুষের ধারণার বাইরে থাকে, যা তাঁদের কাছে অভূতপূর্ব। তাই শিল্পীর মূল কর্তব্য সার্থক শিল্পসৃষ্টি; বরং দর্শকদের বিষয়ে তিনি বিশেষ সচেতনই বলা যেতে পারে, কিন্তু শিল্পসৃষ্টির খাতিরে তিনি দর্শকের কথা মনে রেখে সৃষ্টির ক্ষেত্রে কোনো আপস করতে চান না। একথা তো সত্যি, যত দিন মানুষের সভ্যতা, সংস্কৃতি ইতিহাস বেঁচে থাকবে, তত দিন পৃথিবীর তাবৎ মহৎ শিল্পসৃষ্টি মানুষের আদরের বস্তু হয়ে থাকবে। তারা সেসবের রসাস্বাদন করবে। অজন্তার ছবি, ভারহূত, অমরাবতী বা কোণারকের ভাস্কর্য বা দা ভিঞ্চি, তিশিয়ান, এলগ্রেকো বা রেমব্রান্টের ছবি এবং এ যুগের পিকাসো বা মাতিস, পল ক্লে বা রবীন্দ্রনাথের ছবি সেভাবেই শিল্পপ্রেমিকদের আদরের বস্তু হয়ে রয়েছে। এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। মহৎ শিল্পীরা এ কথা জানেন। প্রকৃতপক্ষে তাঁরা দর্শককে উপেক্ষা করেন না। তাঁরা জানেন, দর্শক একদিন না একদিন নিজগুণে তাঁর সৃষ্টির রসাস্বাদন করতে সমর্থ হবেন। তবে এ কথাও ঠিক, সমস্ত ছবি দর্শকের কাছে দুর্বোধ্য নয়। অনেক উঁচু মানের শিল্পসৃষ্টি হয়তো সহজবোধ্য রূপ ও রীতির জন্য সহজেই সাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সেখানে শিল্পীর সঙ্গে দর্শকের এই আপাতবিরোধটি থাকে না।

প্রকৃতপক্ষে মহৎ বা সার্থক শিল্পের ক্ষেত্রে কমিউনিকেশন কোনো সমস্যা নয়। সার্থক শিল্পী তাঁর নিজের জায়গায় স্থির থাকেন। তা নেমে আসে না। দর্শককে তাঁর সমপর্যায়ে উঠে আসতে হবে। তাঁর নিজের স্বার্থেই উঠে আসা প্রয়োজন। এবং এ জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। কারণ শুধু কমিউনিকেশনের খাতিরে বা সাধারণের বোধগম্য করতে শিল্পী তাঁর উচ্চমান থেকে নেমে আসতে পারেন না। তাহলে সমস্ত ভাস্কর্যের মান নামিয়ে আনতে হয় কৃষ্ণনগরের পুতুলের স্তরে, ছবির মান নামিয়ে আনতে হয় ক্যালেন্ডারের পর্যায়ে, অভিনেতাকে হতে হয় স্টার। এভাবে সমস্ত ক্ল্যাসিক গান, নাচ, থিয়েটার, ফিল্ম, চিত্র, ভাস্কর্যকে পপুলারিটির পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হলে তাদের আর কোনো অস্তিত্বই থাকে না। তারা অশিল্প হয়ে ওঠে। চিত্রকলা, ভাস্কর্য, ফিল্ম, থিয়েটার, সংগীত - এসব কিছুই যখন মহৎ শিল্পপর্যায়ে উঠে আসে, তখন তা হয়ে ওঠে মূলত সূক্ষ্ম, অনুভূতিশীল, গভীর ও সংবেদনশীল। সে কারণে দর্শক বা শ্রোতাকে তা বুঝবার জন্য সমপর্যায়ে উঠে আসতে হবে। তাতে তিনি লাভবানই হন। তবে ইচ্ছে থাকলেও জনসাধারণের সবাই উঁচু স্তরের শিল্পকলা বুঝবার প্রয়োজনে তার সমপর্যায়ে উঠে আসতে পারেন না। তাঁর ক্ষমতা সীমিত, একথা আগেই বলা হয়েছে। উপযুক্ত শিক্ষা ও শিল্পসংস্কৃতি চর্চা অনেক সুপ্ত অথচ সংবেদনশীল মনকে উন্মোচিত করে শিল্পকলা বা সংগীতের তাৎপর্য ও রসাস্বাদনে সাহায্য করে। এ দেশে এখনো খুব সামান্যসংখ্যক মানুষ উঁচু দরের শিল্পসাহিত্যকে নাগালের মধ্যে পান এবং তাঁদের প্রায় সবাই শহর বা শহরতলির বাসিন্দা। অধিকাংশ জনসাধারণ এখনো অর্ধভুক্ত, অশিক্ষিত। জীবনের অবশ্য প্রয়োজনীয় জিনিসগুলোও তাঁদের এখনো জোটেনি। দেশের অধিকাংশ জনসাধারণ অর্থাৎ কৃষক, কারখানার মজুর, মধ্যবিত্ত, কেরানি, স্কুল মাস্টার - এঁরা এখনো এতটা আর্থিক দুর্দশার মধ্যে জীবনযাপন করেন যে তথাকথিত শিল্পসাহিত্যের ব্যাপারে বিশেষভাবে চিন্তা করবার সময় তাঁদের আছে কি? প্রকৃতপক্ষে এ যুগে কৃষক-মজুর-দরিদ্র-মধ্যবিত্তের জন্য আলাদা কোনো শিল্প নেই, সম্ভবত তা সম্ভব নয়। তাই যেটা আশু প্রয়োজন তা হলো, সাধারণের জীবনযাত্রার মানের উন্নতি। আর প্রয়োজন শিক্ষার এ দুটি বিষয়ের ওপর মূলত সবকিছু নির্ভর করছে। সঙ্গে সঙ্গে সমাজে সাংস্কৃতিক আন্দোলন হওয়া প্রয়োজন, যা থেকে একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে উঠবে। অপসংস্কৃতি, অর্থাৎ যা শিল্প নয়, যা কুৎসিত, যেমন বাজে ফিল্ম (মুম্বাইয়ের অর্থহীন অশ্লীল ফিল্ম), থিয়েটার, নাচ, গান, বই - এ সবকিছুর বিরুদ্ধে প্রচার হওয়া প্রয়োজন। তা না হলে যে মানুষগুলো শিল্পকলার দর্শক হয়ে উঠতে পারত, তাঁরা আজ অপসংস্কৃতির মোহে মানসিকভাবে বিকিয়ে যাচ্ছেন। ফলে, এ ক্ষেত্রে কমিউনিকেশনের প্রশ্নটি অবান্তর হয়ে উঠছে। তখন কাদের সঙ্গেই বা কমিউনিকেশন?

এখনো একটি নিটোল শিল্পসংস্কৃতিময় জীবনযাত্রা থেকে যে আমরা অনেক দূরে রয়েছি তা খুবই সত্যি। মধ্যবিত্ত বাঙালির শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি আকর্ষণ সুবিদিত। কিন্তু এ সত্ত্বেও তাঁর ঘরে গিয়ে দেখবেন, কিছু রবীন্দ্রনাথের বই (সেটা রীতি হয়ে গেছে, কারণ রবীন্দ্রনাথ আমাদের প্রিয় এবং গুরুদেব), হয়তো কিছু আধুনিক লেখক ও কবির উপন্যাস ও কবিতার বইও তাকে সাজানো, সঙ্গে ‘উল্টোরথ’, ‘আনন্দলোক’। দেয়ালে আর্ট: কৃষ্ণনগরের টিকটিকি, একটি আরশোলাকে মুখে করে মাথা উঁচু করে আছে (কী দারুণ হয়েছে, মনে হচ্ছে সত্যি জীবন্ত!), তাকের ওপর মোষের সিং দিয়ে তৈরি সরু গলা বক ঘাড় নিচু করে আছে, এদিকে এক জোড়া, ওদিকে এক জোড়া। আর আছে ক্যালেন্ডার, ঘরভর্তি কালী, দুর্গাÑ কত কী! এমনকি অমিতাভ বচ্চন পর্যন্ত। আরও আছে প্লাস্টার ছাঁচে টানা টানা চোখ মা-দুর্গার মুখ এবং বাটিকের কাজ, শিবের তা-ব নৃত্য ইত্যাদি। অবশ্য কলকাতা শহরে অনেক সাংস্কৃতিক কর্মকা- চলছে। বইমেলা, রবীন্দ্রসদনে ২৫ বৈশাখে ভিড় করে গান শোনা, ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে গদার ফেলিনি কুরোওশোয়া এবং সদ্য সদ্য ‘রঁদ্যা শো’। আমার মনে হয় এ শহরে সংস্কৃতিমনস্কতা ব্যাপারটি ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ বাঙালিরা সৌভাগ্যবান, তাঁরা কালচারকে ফ্যাশনের মধ্যে মেলাতে পেরেছেন। বিশেষ করে বিড়লা আকাদেমিতে এলে তাঁকে দেখতে এর থেকে বেশি ভিড় হতো। আমার মনে পড়ে, ত্রুুশ্চেভ-বুলগানিন যখন ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে বক্তৃতা দিতে এসেছিলেন, তখন কী ভিড়টাই না হয়েছিল! অবশ্য সে ব্যাপারটি ছিল রাজনীতিমনস্কতা। যা হোক, আমরা খুশি এ জন্য যে, এই সংস্কৃতিমনস্কতা সাহিত্যশিল্পের ক্ষেত্রে বিশেষ উৎসাহের ব্যাপার। অর্থাৎ এ ব্যাপারটি হচ্ছে শিল্পের সোশ্যাল বা পাবলিক অ্যাকসেপট্যান্স; অর্থাৎ শিল্পকলা যে একটি বিশেষ প্রয়োজনীয় ব্যাপার, তা জনসাধারণ স্বীকার করেছেন। যদিও হয়তো তাঁদের একটি বড় অংশই প্রকৃতপক্ষে এই শিল্পকলার রসাস্বাদনে পুরোপুরি সক্ষম নন। এখানে দু-একটি কথা বলি। মনে হয় অপ্রাসঙ্গিক নয়। এক, যখন বিড়লা আকাদেমিতে রঁদ্যা প্রদর্শনী চলছিল তখন একজন তরুণ চিত্রকর আকাদেমির পাঁচতলায় দর্শকের অপেক্ষায় একা বসে ছিলেন। দুই, রঁদ্যা তাঁর জীবদ্দশায় এক প্রচ- সৃষ্টিশীল আবেগের তাড়নায় তাঁর ভাস্কর্যগুলো সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি কি জানতেন, আজ বহু বছর পরে তাঁর সৃষ্ট শিল্পকর্মগুলো দেখবার জন্য লাখ লাখ বাঙালি এমন উতলা হয়ে উঠবেন? তিনি কি সৃষ্টির প্রাক্কালে বাঙালি দর্শকের কথা মনে রেখেছিলেন? সম্ভবত নয়।

মোট কথা দাঁড়াচ্ছে, সূক্ষ্ম শিল্পবোধসম্পন্ন জনসাধারণের সংখ্যা সীমিত। অর্থাৎ কোনো ক্ষেত্রেই তারা সম্ভবত সমগ্র লোকসংখ্যার ত্রিশ শতাংশের বেশি নয়। অথচ আমাদের দেশে এই সম্ভাব্য শিল্পবোধসম্পন্ন জনসাধারণকেও শিল্পসংস্কৃতির মুখোমুখি নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। তাহলে কলকাতা শহরে ৩০ লাখ এবং সারা পশ্চিমবঙ্গে দেড় কোটি মানুষ শিল্পকলা বিষয়ে আন্তরিকভাবে কৌতূহলী হয়ে উঠতে পারত। বাস্তবে, কলকাতা শহরে অন্তত কয়েক লাখ মানুষ নিশ্চয়ই শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ে উৎসুক এবং এখানে বেশ কিছু সত্যিকারের বোদ্ধা ও ব্যক্তি তো রয়েছেনই। কিন্তু সারা পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে বা ছোট ছোট শহরে বাকি যে চার কোটি লোক রয়েছেন, তাঁদের কজনই-বা সূক্ষ্ম শিল্প-সাহিত্য বুঝতে বা তা নিয়ে ভাবতে সুযোগ পাচ্ছেন? প্রকৃতপক্ষে সমগ্র দেশবাসীর জীবনযাত্রার মান এখনো এতখানি অনুন্নত যে তাদের জীবনে তথাকথিত শিল্পসাহিত্যের ভূমিকা প্রায় কিছুই নেই। হয়তো তাঁরা এ নিয়ে কোনো রকম চিন্তাই করেন না। চিত্রকলা বা ভাস্কর্য বিষয়টি তো আরও দূরের বিষয়। তা ছাড়া যাঁদের কিছু ঔৎসুক্য রয়েছে বা শিল্পরুচিসম্পন্ন, তাঁদেরই বা সময় কোথায়? জীবনের রুজিরোজগারের চেষ্টায় পরিশ্রমে তাঁরা ক্লান্ত থাকেন। তাঁদের থাকার বাসস্থান নেই। এ ক্ষেত্রে কজন মানুষ চিত্রকলা বা ভাস্কর্যের সৌন্দর্য বা তার সূক্ষ্ম শিল্পবোধ নিয়ে মাথা ঘামাতে পারেন? তা ছাড়া শিক্ষাদীক্ষার ব্যাপার তো আছেই। এখনো তো বিরাটসংখ্যক জনসাধারণ অশিক্ষার অন্ধকারে রয়েছে। যাঁরা একটু শিক্ষিত তাঁরাও কি খুব উঁচু মানের শিল্পসংস্কৃতির সংস্পর্শে আসবার সুযোগ পাচ্ছেন? তেমন ব্যবস্থাই বা কই? আর একটি দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, গ্রামীণ শিল্পসংস্কৃতিগুলোও আস্তে আস্তে লুপ্তপ্রায়। তার পরিবর্তে কোনো সুস্থ শিল্পসংস্কৃতিও গ্রামে বা ছোট ছোট শহরে গড়ে উঠছে না। যা হচ্ছে তা হলো সিনেমা হল এবং তার মাধ্যমে রুচিহীন হিন্দি ফিল্মের প্রসার। সরকারও এসব বিষয়ে সুচিন্তিতভাবে কিছু করেনি বা করছে না। গ্রামে গ্রামে সুস্থ সাংস্কৃতিক জীবন গড়ে তোলার জন্য একটি সুচিন্তিত কর্মসূচি সরকারের নেওয়া উচিত নয় কি? চিত্রশিল্পের ক্ষেত্রে বলা যায়, একটি সমকালীন শিল্পকলার মিউজিয়াম এ শহরে এখন পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি। অথচ আধুনিক শিল্পের ইতিহাসে বাংলাদেশের ভূমিকা যথেষ্ট প্রয়োজনীয়। আবার শিল্পকলা ও জনসাধারণের মধ্যে সত্যিকারের কমিউনিকেশন গড়ে তোলাও সব থেকে অপরিহার্য।

এসব নানা কারণে মনে হয় চিত্রশিল্পের কমিউনিকেশনের বিষয়টি যে পরিস্থিতিতে রয়েছে, তার মৌলিক পরিবর্তনের জন্য সব থেকে প্রয়োজন দেশের আর্থিক ও সামাজিক পরিবর্তন, যার ফলে অধিকাংশ জনসাধারণের জীবনযাত্রা হয়ে উঠবে সচ্ছল, সুখী, শিক্ষিত এবং সর্বোপরি শিল্পসংস্কৃতিময়। এলোমেলোভাবে অবশ্য সবকিছুই ছিটেফোঁটা হচ্ছে। তা ছাড়া আপাতত কিছু হবার উপায়ও তো দেখছি না।

সংকলিত : প্রতিক্ষণ
১৭ জুলাই ১৯৮৫