পাখির উল্লাসে উড়তে উড়তে...

কিছু কিছু সৌন্দর্যের বর্ণনা দেওয়া ভীষণ কঠিন। অনেক সৌন্দর্য একসঙ্গে ভিড় করলে তা সম্ভবত বিস্ময়! ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ সে রকমই বিস্ময়ের উদ্রেক করেছিল আমার মনে। স্পেনের বার্সেলোনার স্ট্রিট আর্ট থেকে শুরু করে প্যারিস শহরের সৌন্দর্য পর্যন্ত! এক মাসে তেরোটি দেশ ভ্রমণ সত্যিই সর্বক্ষণ মুখে হাসি ছড়িয়ে রেখেছে আমার। একদমই ক্লান্ত নই ভ্রমণ নিয়ে লিখতে বানানো গল্প বর্ণনা করতে।

ঢাকা থেকে স্পেনের বার্সেলোনা। চমৎকার শহর, কিছু অংশ পাহাড়ের কোল ঘেঁষে আর বাকি অংশ ভূমধ্যসাগর পাড়ে। অপূর্ব স্থাপত্যশৈলী শহরজুড়ে। কাতালান (ঈধঃধষধহ) প্রদেশের আধুনিক এই স্থাপত্যের পেছনে আছেন বিখ্যাত আর্কিটেক্ট অহঃড়হর এধঁফর, যিনি ছিলেন কাতালান মডার্নিজমের একাংশ।

পিকাসো মিউজিয়াম দর্শন ছিল জীবনের এক বড় অভিজ্ঞতা। বিশাল এই সংগ্রহশালায় আছে পিকাসোর পেইন্টিং, ড্রয়িং, খোদাই এবং সিরামিকের আসবাব। শিক্ষানবিশ অবস্থা থেকে শুরু করে পুরোদস্তুর একজন আর্টিস্ট হওয়া পর্যন্ত অনেক চিত্রকর্ম।

বিশাল নীল আকাশ, নীল সমুদ্র, শহরজুড়ে অপূর্ব স্থাপত্যশৈলী, মিউজিয়াম, বিস্ময়কর স্ট্রিট আর্ট দেখে পার করেছি পাঁচটি দিন বার্সেলোনা আর মাদ্রিদে।

পর্তুগালের লিসবন শহরে যখন পৌঁছি, খুব সকাল। ভাস্কো দা গামা এই পর্তুগালেরই ছিলেন। লোকজন খুব একটা ইংরেজি জানে বলে মনে হলো না। যখনই ট্রেনের কোনো কর্মীকে জিজ্ঞেস করেছি, লিসবনের স্টেশন কত দূর, শুধু

উত্তর - এক ঘণ্টা পর। দুবার এক ঘণ্টা পার হলে নেমেছি, নামতেই আরেক কর্মীর পর্তুগিজ আর ইংরেজি মেশানো কথায় বুঝেছি আর এক স্টেশন পর। হুড়মুড় করে সবাই মিলে ট্রেনে আবার চড়ে বসা।

মারকুইস স্ট্রিট, পর্তুগালের মেইন স্কয়ার। ৩০.৬.১৬ তে পোল্যান্ড আর পর্তুগিজের ইউরোপিয়ান কাপ সেমিফাইনালে ওঠার ফুটবল খেলা ছিল। লড়াইয়ে পর্তুগাল জিতেছিল ওই রাতে। শহরের উল্লাস ছিল গাড়ির হর্ন বাজিয়ে। ছোট ছোট ছেলের দল রাস্তায় দাঁড়িয়ে পতাকা হাতে। ছুটে চলেছে সবাই মারকুইস স্ট্রিটের পথে, সমবেত উল্লাস করতে। সারা রাত উৎসবে মেতেছিল এই অপূর্ব সুন্দর শহর, যা আজীবন মনে থাকবে। শহরের উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান যেমন গঁংবঁস ড়ভ ধৎপযবড়ষড়মু, ঞড়ৎৎব ফব ইবষবস, ঝধহঃধ গধৎরধ ফব ইবষবসসহ পুরো লিসবন শহর, ঈধংপধরং-এর মতো অপূর্ব আটলান্টিকের পাড়ের শহর ঘুরে বেড়িয়েছি, সঙ্গে পর্তুগিজ মজাদার খাবার আর ফোক মিউজিক।

পরের যাত্রা ছিল জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট, চেক রিপাবলিক, লিখটেনস্টাইন, অস্ট্রিয়া, সুইজারল্যান্ড, ইতালি, মোনাকো, প্যারিস। এ কটি দেশের বেশির ভাগ শহরের স্থাপনায় কাঠামোগত সাদৃশ্য লক্ষ করেছি। প্রতিটি শহর কোনো না কোনো নদীর তীর ঘেঁষে এবং তার ওপর নয়নাভিরাম স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত ব্রিজগুলো সত্যিই নজর কেড়েছে। উল্লেখ্য, প্রাগের চার্লস ব্রিজ, ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরের রাইন নদীর ওপর নির্মিত ব্রিজ, প্যারিসের সেইন নদীর ওপরের ব্রিজগুলো একেকটি একেক রকম শিল্পশৈলীর নিদর্শন।

শুনেছি ইউরোপের শহরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পর্যটকের আগমন প্রাগ ক্যাসল সিটিতে। অপূর্ব সব ভাস্কর্য এই চার্লস ব্রিজে। ব্রিজের ওপর থেকে শহরের একাংশ দেখে প্রাণ জুড়িয়ে যায়। যতবারই কোনো পাহাড়ের ওপর থেকে শহর দেখেছি, মনে হয়েছে, কী নেই এদের! সৌন্দর্যবোধ হলো বড় এক সম্পদ!

বুদাপেস্টের স্ট্যাচু অব লিবার্টি যেখানে অবস্থিত, তার নাম ছিটাডেলা (ঈরঃধফবষষধ)। পাহাড়ের ওপর শান্তির বার্তা হাতে এক নারী। দেখছি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ভবনের একটি বুদাপেস্ট পার্লামেন্ট ভবন।

অস্ট্রিয়ার ভিয়েনার গোল্ড কনসার্ট হলে ‘ঠরবহহধ গড়ুধৎঃ ঙৎপযবংঃৎধ’ পরিবেশনা, এক অভিজ্ঞতা বটে! ব্যাকুল করা সুরের মূর্ছনায় আচ্ছন্ন

হয়েছিলাম আমরা হলভর্তি মানুষ, দুই ঘণ্টা। তারপর বিখ্যাত মোজার্টের জন্মস্থান পরিদর্শন করে রওনা হই সুইজারল্যান্ডের পথে মাউন্ট তিতলিসের উদ্দেশে। ৩২৩৮ মিটার সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ওপরে। দুবার কেব্ল কার বদল করে উঠলাম পাহাড়ের বরফঘেরা চূড়ায়। প্রথমেই যেমন বলেছিলাম, বিস্ময় ইউরোপের চারদিকে! সুইজারল্যান্ড প্রকৃতির এক অবাক বিস্ময়!

সুইজারল্যান্ড ছেড়ে ইতালির মিলানের পথ: পাহাড়ের কোল, ঢাল, টানেল অপূর্ব দৃশ্য ছিল ৪ ঘণ্টা ধরে আমাদের ঠিক সঙ্গে। অনেক সুন্দর কিছু কেন যেন মনকে ব্যাকুল করে দেয়।

পরের তিন দিন পার করেছি ইতালির মিলান, ভেনিস, রোম আর ভ্যাটিকান শহরের মিউজিয়াম ঘুরে। আর্ট আর ভাস্কর্যের স্বর্গরাজ্য ভ্যাটিকানের মিউজিয়াম। সিস্টিন চ্যাপলের ছাদে বিখ্যাত গরপযবষধহমবষড়-এর আঁকা চিত্রকর্ম আর ভাস্কর্য পিয়েটা (চরবঃধ) দেখছি নীরবে। এত যুগ আগেও শিল্পের সাধনা, এই মিউজিয়ামের ৩৫টি গ্যালারি ঘুরে না দেখলে কখনোই শিল্পের এই বিশাল ভান্ডার সম্পর্কে জানা হতো না। ইতালির বিভিন্ন শহরজুড়ে চোখধাঁধানো সব ভাস্কর্য।

ধনকুবের অপূর্ব দেশ মোনাকো। অসম্ভব পরিচ্ছন্ন এক শহর। সবুজ পাহাড় আর নীল সমুদ্র এদের সম্পদ। সমুদ্র আর পাহাড় পেরিয়ে ফ্রান্সের পথ।

প্যারিস শহরে যেন ইউরোপের অন্য শহরগুলোর ছোঁয়া পেলাম। লুভর মিউজিয়াম, আইফেল টাওয়ার, ছেইন নদীতে রিভার ক্রুজ যেন ফিরে গিয়েছিলাম ফেলে আসা ইউরোপের অন্য দেশগুলোতে। সৃষ্টিকর্তা ইউরোপকে ঢেলে দিয়েছেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর মানুষ সেই সৌন্দর্যকে মেখে হয়েছে সৌন্দর্যবোধবিশিষ্ট জাতি। আমার ক্ষণিকের দেখা এই সৌন্দর্য বুকে ধারণ করব যত দিন বাঁচি।