অভি শংকরের অভিবাদন

সফেদ হলঘরটিতে পা রেখেই দর্শক ভড়কে যেতে পারেন, এত সাদা, মনে হতে পারে একঘেয়ে কিছু না তো! কিন্তু উত্তর পাওয়া যাবে পুরোটা ঘুরে দেখার পর। বলছি অভি শংকর আইনের দ্বিতীয় একক প্রদর্শনী ‘ম্যানগ্রোভ পোর্টাল’-এর কথা। গত ৭ জুলাই ২০১৭ শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী ১২ দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হলো আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের লা গ্যালারিতে।

শিল্পী যেন একটি গল্প বলতে চেয়েছেন, ঠিক যেভাবে প্রিয় লেখকের লেখনীতে সওয়ার হয়ে আমরা বেড়িয়ে আসি রহস্যময় মিসর থেকে শুরু করে পুয়ের্তোরিকোর সমুদ্রসৈকত; ঠিক তেমন করেই অভি আমাদের নিয়ে গেছেন পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, সুন্দরবনে। গোলপাতার নকশাকাটা ঝাড়, সুন্দরীগাছের রূপের চমক, সোনাগলা সূর্যের আলো, গোধূলির বিষণœতা, জোয়ার-ভাটার জলের টানে তৈরি হওয়া সর্পিল পথÑ কিছুই বাদ পড়েনি সেই ভ্রমণকাব্য থেকে।

শিল্পীর আগের কাজগুলো যারা দেখেছেন তাদের চোখে পড়বে, এবার শিল্পী বাঁধনহারা। এই কাজগুলো সাদা চোখে দেখে শুধু একজন দক্ষ তুলি-চালকের জড় ক্যানভাসকে জীবন দেবার প্রয়াস নয়। এবার দক্ষতার সঙ্গে যোগ হয়েছে শিল্পীর অন্তর্দৃষ্টি।

তার কাজের ভিন্নতা যে রহস্যর মায়াজালে ঘিরে ধরে আমাদের, তার উত্তর খুঁজতে রহস্যকারকে খুঁজলাম, কথা হলো তার সঙ্গে।

শিল্পী বললেন, ‘আমি আসলে নিরপেক্ষ একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে সুন্দরবনের সৌন্দর্য নিয়ে কাজ করতে চেয়েছি।’

জানালেন শঙ্কার কথাও, ‘বর্তমান সমস্যার বাইরেও আমি শঙ্কিত প্রতিনিয়ত যে অবক্ষয় সুন্দরবনের হচ্ছে তা নিয়ে। কিছুদিন আগেও যেমনটা দেখা যেত, এখন তেমনটা নেই। দিন দিন যেন ফুরিয়ে যাচ্ছে এই সম্পদ।’

জানতে চাইলাম চিত্রকর্মগুলোতে সাদার প্রাধান্যের ব্যাপারে। অভি বললেন, ‘একটা সুন্দর স্বপ্নের ঘোরে আমি চলে গেছিলাম আর সেই রহস্যের ঘোর মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছি। সে ভাবনা থেকেই সাদার প্রাধান্য।’

লক্ষ করলাম, বিভিন্ন জ্যামিতিক ফর্মের সম্মিলন চিত্রকর্মগুলোতে। জ্যামিতিক ফর্ম অনেক শিল্পীর চিত্রকর্মেই বারবার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠতে দেখা গেছে, লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, লায়বভ পাপভা, পাবলো পিকাসোর কাজে বরাবর জ্যামিতিকতা হয়েছে মূল শিল্পকৌশলের অংশ। অভির জ্যামিতিকতার ব্যবহার অবশ্য ভিন্ন। এখানে জ্যামিতিক ফর্ম একটা বিচ্ছিন্নতা এনে দিয়েছে, পাশাপাশি তৈরি করেছে সংযোগও। অভির ব্যাখ্যাটা শোনা যাক, ‘সুন্দরবনের জোয়ার-ভাটার প্রভাবে এবং এখানকার গাছেদের ভিন্ন বাস্তুসংস্থান ব্যবস্থার কারণে গাছ বা গোলপাতার ঝাড়গুলো, সুন্দরীগাছগুলো এমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকে যেন এডওয়ার্ড সিজারহ্যান্ড এসে এমন জ্যামিতিকভাবে সাজিয়ে দিয়ে গেছে তাদের, সেটারই একটা প্রতিচ্ছবি তুলে ধরতে চেয়েছি।’

দর্শকমাত্রই লক্ষ করবেন, চিত্রা হরিণ ছাড়া অন্য কোনো প্রাণী দেখা যাচ্ছে না শিল্পীর তুলে আনা সুন্দরবনে। এর ব্যাখ্যায় শিল্পী বললেন, ‘সুন্দরবনে গেলেই আমি প্রথম হরিণ দেখি, চিত্রা হরিণ। যেন আমাকে স্বাগত অভিবাদন জানাচ্ছে। সেই অসাধারণ আবেগীয় অনুভূতি আমি সবাইকে দেখাতে চেয়েছি।’

শিল্পীর এমন ব্যাখ্যায় কোথাও কি একটা ম্যানগ্রোভ পোর্টালের ধারাবাহিক প্রদর্শনীর ইঙ্গিত পাইÑ শিল্পী অবশ্য শিল্পীর মতোই উত্তর দিলেন, ‘হতে পারে, না-ও হতে পারে। হলেও তো তাতে অনেকটা সময় দরকার।’

পরিবর্তিত শিল্প ধরন নিয়ে তিনি জানালেন, তিনি নিজেকে ভেঙে বারবার বেরিয়ে আসতে চান। মানুষের দেখার চোখ পরিবর্তিত হয়। তাই তিনি নিজের ভাবনা এবং সদা পরিবর্তনশীল দৃষ্টিভঙ্গির সংমিশ্রণকে ক্যানভাসে আটকে ফেলতে চান।

প্রতিটি শিল্পকর্মে বিশেষ রঙের প্রাধান্যে যেন নির্দিষ্ট একটা সময়কে ক্যানভাসে ছড়িয়ে দিয়েছেন। কোনোটাতে যেন গোধূলির কন্যা সুন্দর আলো ছড়ানো, কোনোটায় আবার সন্ধ্যার ফিরোজা রঙের বিষণœতা, চিকচিকে রুপা গুঁড়া করা বালি, সোনা গলা রোদÑ সব যেন এক বিশেষ সত্তা হয়ে ছড়িয়ে গিয়ে আবার এক হয়েছে কোনো অদৃশ্য বিন্দুতে। কিংবা বিন্দু থেকে বিকিরিত হয়ে মিলিয়ে গেছে যেভাবে রাঙা ধুলোর পথ দিগন্তে মিলায়, ধূসর আর আবছা হয়ে। সফেদ সাদা মিনিমাল পেইন্টিংগুলোতে চিত্রা হরিণের নানা রকমের ভঙ্গিমা এবং ভিন্ন ভিন্ন সময়ের রংই পেইন্টিংগুলোর আলাদা বিশেষত্ব সৃষ্টি করেছে। শিল্পীর দ্বিধাহীন রঙের প্রয়োগই বলে দিচ্ছে রং নিয়ে কত স্বাধীন নিরীক্ষা চলেছে ক্যানভাসে। স্নিগ্ধ সাদাই যে কত রং নিজের মাঝে ধারণ করে স্নিগ্ধতা লাভ করে, তাই যেন প্রতিফলিত হচ্ছিল গ্যালারিজুড়ে।

শিল্পী শ্বাসমূলগুলোকে রঙের ঘনত্ব ব্যবহার করে ত্রিমাত্রিক রূপ দিয়েছেন, করে তুলেছেন জীবন্ত। সুন্দরীগাছের পাতা যেন হয়ে উঠেছে সূর্যের প্রতিচ্ছবি। চিত্রকর্মগুলোর নামের জন্য তিনি স্প্যানিশ, ল্যাটিনের মতো প্রাচীন ভাষার আশ্রয় নিয়েছেন।

কখনো কল্পলোকের এই হরিণেরা ব্যস্ত খাদ্য সংগ্রহে, কখনো চমকে তাকাচ্ছে, কখনো-বা ছুটে পালাচ্ছে প্রাণভয়ে, কখনো ঝড়ের পর নতুনের দিকে পা বাড়াচ্ছে, কোথাও আবার পরিশ্রান্ত হয়ে শুয়ে আছে। যেমন ‘রেলিকাস’-এ আমরা দেখি প্রকৃতির বৈরী ঝড়ের ধ্বংসস্তূপকে পেছনে ফেলে নতুন জীবনের খোঁজে দিগন্তের দিকে চলেছে হরিণেরা। ‘টিমর’-এ ভীত বিহ্বল পায়ে তারা ছুটে চলেছে হয়তো, আবার ‘ফিলিয়া’তে আমরা দেখি যুগলের অনুরাগী রূপ। যেন জীবনের নানা রূপে বন্দি হয়ে আছে পাশাপাশি।

অ্যাক্রিলিক মাধ্যমে ক্যানভাসের ওপর অভি বাংলার এই স্বর্গধামের রূপ কী শুভ্র সুন্দর রহস্যেই না তুলে ধরেছেন। যে অভিবাদনে মুগ্ধ হয়ে চিত্রকর্মের স্রষ্টা এই কর্মযজ্ঞে হাত দিয়েছেন, সেই অভিবাদন স্পর্শ করবে দ্রষ্টাকেও।

ভাবনার গভীরে যাবার এবং নিজের মতো মানে খোঁজার অনেক সুযোগ রয়েছে এই চিত্রকর্মগুলোতে, শিল্পী তা ছেড়ে দিয়েছেন দর্শকের ওপর।

মোট পঁচিশটি ছবি স্থান পেয়েছিল এই প্রদর্শনীতে।

প্রকৃতিপ্রেমিক দর্শক পেতে পারেন এই স্বর্গভূমকে অবক্ষয়ের হাত থেকে বাঁচাবার অনুপ্রেরণা। কয়েক যুগ পর ইতিহাসবিদ সুন্দরবনের অতীত খুঁজতে টানতে পারেন ম্যানগ্রোভ পোর্টালের উদাহরণও। শিল্পপ্রেমিক বিস্মিত হতে পারেন শিল্পশৈলীর নিপুণতায়। সাধারণ মানুষের কাছে ধূম্রজালে ছেয়ে থাকা এই শহরের জঞ্জাল থেকে চোখ সরিয়ে এক টুকরো শান্তি দেখার সুযোগ হতে পারে শিল্পীর সৃষ্টিগুলো।

তাঁর দক্ষ নিপুণ শিল্পশৈলী, নিগূঢ় ভাবনার যুগলবন্দিতে সুন্দরবনকে ইট-পাথরের এই কঠিন শহরে তুলে এনে তিনি যে অভিবাদনের স্মৃতিচারণা করেছেন, সেই অভিবাদন ছুঁয়েছে দর্শককেও।