বাংলাদেশের হৃদয়ের রং

বাংলাদেশ ও ফিলিপাইনের প্রকৃতিতে সাজুয্য অনেক, দুই দেশেই বর্ষার বাহুল্য, আর কৃষিই গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মূল জীবিকা। তাই বোধ হয় দুই দেশের প্রকৃতির রঙেও মিল রয়েছে। প্রধান রং যদিও সবুজ, তবু ফুল আর ফলের সমারোহে এবং ঋতুবৈচিত্র্যে আরও বিচিত্র রঙের সমাগম হয়েছে। এশিয়ার এই দুই দূরের দেশেই যে একই রকম প্রাকৃতিক ঐশর্য, তা আগন্তুকের কাছে হঠাৎ আবিষ্কারের বিষয়ই বটে।

বাংলাদেশের রঙের সঙ্গে এ দেশের সুধী মহলের পরিচয় ঘটিয়ে সেই অন্য রকম সুন্দরের মিলটা ধরিয়ে দিতে তাই ফিলিপাইনে বাংলাদেশ দূতাবাস বাংলাদেশি শিল্পীদের শিল্পকর্ম নিয়ে জুন মাসের শেষার্ধে চার দিনের একটা প্রদর্শনীর আয়োজন করে স্থানীয় গ্যালারি A SPACE এ। প্রায় পঁয়ত্রিশটি বিভিন্ন ধরনের শিল্পকর্মের স্থান হয় প্রদর্শনীতে। এর শিরোনাম ছিল Colors of Bangladesh। বাংলাদেশ নিয়ে এখানে আগে কখনো বাংলাদেশের উদ্যোগে শিল্প প্রদর্শনী হয়েছে কি না, তা বলা মুশকিল। দলিলপত্রে তেমন সাক্ষ্য পাওয়া যায় না। অনেক আগে, সত্তরের দশকের মাঝামাঝি, ফিলিপাইনের বিখ্যাত শিল্পী পাসিতা আবাদ তাঁর শিল্পকর্ম নিয়ে একটা প্রদর্শনী করেছিলেন ম্যানিলায়। আবাদ তাঁর স্বামীর কর্মসূত্রে ঢাকায় ছিলেন বছরখানেক। ঘুরেছেন বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে সিলেট, চট্টগ্রামে। সে সময় প্রচুর ছবি এঁকেছেন বাংলাদেশের মানুষের, প্রকৃতির, উৎসবের। সেসব কাজ নিয়ে প্রথম প্রদর্শনী করেন ঢাকায়, দ্বিতীয়টি করেন ম্যানিলায়। আমাদের জাতীয় জাদুঘরের সংগ্রহে আছে তাঁর আঁকা ছবি। বেশ কয়েক বছর আগে পাসিতা মারা যান ক্যানসারে। ম্যানিলায় বাংলাদেশের ওপর প্রথম প্রদর্শনী করা শিল্পী হিসেবে পাসিতাকে উৎসর্গ করা হয় Colors of Bangladesh প্রদর্শনীটি।

স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের শিল্পকর্ম বিদেশে প্রচার ও প্রসার করার একটা স্বপ্রণোদিত উদ্যোগের ঐতিহ্য রয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশের শিল্পকর্ম উপহার হিসেবে দেওয়ার চল সেই সময় থেকেই। মন্ত্রণালয়ের নিজের রয়েছে শিল্পকর্মের বিরাট সংগ্রহ। ঢাকায় মন্ত্রণালয়ে, বিদেশে দূতাবাসগুলোতে, রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে এসব শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়ে থাকে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার হিসেবে, কূটনীতির সাম্প্রতিক পরিভাষায়, বাংলাদেশের ‘সফট পাওয়ারের’ অংশ হিসেবে।

ফিলিপাইনে বাংলাদেশ দূতাবাসও এই উদ্যোগের বাইরে নয়। দূতাবাসের নিজস্ব সংগ্রহে যেমন রয়েছে পটুয়া কামরুল হাসান, সৈয়দ জাহাঙ্গীর, আবদুস সাত্তারের মতো অগ্রজ শিল্পীদের শিল্পকর্ম, তেমনি রয়েছে শেখ আফজাল, সামসুজ্জোহার মতো অপেক্ষাকৃত পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীদেরও কাজ। বাংলাদেশ ভবনের সংগ্রহেও রয়েছে প্রবীণ ও নবীন শিল্পীদের চিত্রকর্ম। মূলত এসব সংগ্রহ থেকেই এই প্রদর্শনীর আয়োজন। এর মূল সুর বাংলাদেশের বিভিন্ন চিত্রকর্মের কোলাজ। প্রদর্শনীটি কিউরেট করেছেন গ্যালারি A SPACE-এর অভিজ্ঞ আয়োজকেরা।

সৌভাগ্যক্রমে বিভিন্ন সময়ে এসব শিল্পকর্ম দূতাবাসে সংগৃহীত হলেও এখানে প্রবীণ ও নবীন সব প্রজন্মের শিল্পীদেরই শিল্পকর্ম ছিল। ছিল বিভিন্ন মাধ্যমের শিল্পকর্মও, ফলে বাংলাদেশের শিল্পচর্চা বা আন্দোলনের একটা ক্রমবিবর্তনের ধারা বেশ স্পষ্টভাবেই প্রদর্শনীতে বিম্বিত হয়েছে।

প্রদর্শনীতে আবদুস সাত্তার, আহমেদ নাজির, হাসি চক্রবর্তী, কাজী সালাহউদ্দিন আহমেদ, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, সামসুজ্জোহা, শেখ আফজাল, সুমনা হক প্রমুখের তেলরঙের কাজ প্রদর্শিত হয়েছে। জলরঙের কাজগুলো ছিল অলকেশ ঘোষ, হামিদুজ্জামান খান, মানিক বণিক, রাশিদুল মানিক, শাহানুর মামুন, সমরজিৎ রায় চৌধুরী ও সোহাগ পারভেজের। প্রিন্ট মাধ্যম ও মিশ্র মাধ্যমে যেসব ছবি প্রদর্শিত হয়েছে সেগুলো হলো আমিনুল ইসলাম, বীরেন সোম, হাশেম খান, কামরুজ্জোহা, কনক চাঁপা চাকমা, খালিদ মাহমুদ মিঠু, মোহাম্মদ জাফর ইকবাল, মনিরুল চৌধুরী ও আবুল বারক আলভীর ড্রয়িং এবং শফিকুল কবির চন্দনের ট্যাপেস্ট্রি ছিল প্রদর্শনীতে।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ও তাঁর সহকর্মীদের উদ্যোগে, ত্যাগে ঢাকায় আর্ট কলেজ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সে সময়কার সমাজে যে শিল্প আন্দোলনের গোড়াপত্তন, তা কেমন করে একটা নতুন জাতির মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে যায়, তা আমাদের শিল্পীদের আঁকা ছবিতে প্রতিফলিত হয়েছে। আমাদের অগ্রজ শিল্পীরা রঙের মধ্য দিয়ে একটা নতুন জাতির আশা, আকাক্সক্ষা এবং মুক্তি ও স্বাধীনতার স্বপ্নের ভাষা খুঁজে নেবার দায়িত্ব নিজেদের ঘাড়ে তুলে নিয়েছিলেন। অনুপ্রেরণা আর স্বকীয়তার জন্য তাঁরা ফিরে গিয়েছিলেন আমাদের হাজার বছরের লোকজ, কারুজ ও গ্রামীণ ঐতিহ্যের কাছে। সেখান থেকে তাঁরা তুলে এনেছেন নানা উপকরণ, প্রকরণ, টেকনিক, মোটিফ আর প্যাটার্ন; ব্যবহার করেছেন তাঁদের কাজে। তারপর ক্রমে রক্তক্ষয়ী মুক্তি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে; আধুনিক শিল্পকলা ও তার শিক্ষা সমাজের আস্থা ও ভালোবাসা পেয়ে নিজস্ব অবস্থান করে নিয়েছে। শিল্পকলা নতুন দেশের নিজস্ব পরিচয় ও গর্বের ভাষা হয়ে উঠেছে। আমাদের শিল্প যেমন বাইরের পৃথিবীতে নিজেকে গর্বের সঙ্গে উপস্থাপন করেছে, তেমনি আমাদের শিল্পীরাও বাইরের বিভিন্ন শিল্প আন্দোলন, ধারা ও টেকনিকের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন। পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর মিথস্ক্রিয়ায় নতুন বোধ, টেকনিক আর সম্ভাবনা আবিষ্কৃত হয়েছে, যা তাঁদের কাজে প্রতিফলিত হয়েছে। যোগ-বিয়োগ আর দেওয়া-নেওয়ার মধ্য দিয়ে আমাদের চিত্রকলা আজ তাই শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র বিশে^রও বটে।

প্রদর্শনীর শিল্পকর্মের মধ্য দিয়ে এই পুরো বিবর্তনটিই প্রকাশিত হয়েছে। প্রদর্শনীর তেলরং আর জলরঙের কাজ ছিল মূলত বাংলাদেশের গ্রামীণ প্রকৃতির প্রতিফলন। কোনো কোনো ফিলিপিনো দর্শক এই কাজগুলো দেখে প্রশ্ন করেছেনÑ এগুলো বাংলাদেশ, না ফিলিপাইনের গ্রামের দৃশ্যয় বিস্মিত হয়েছেন সাদৃশ্যে। প্রিন্ট, এচিং, ট্যাপেস্ট্রি ইত্যাদি অন্য মাধ্যমে বিমূর্ত উপাদান ব্যবহৃত হয়েছে। আধুনিক নাগরিক দর্শক হিসেবে তা-ও দর্শকদের আকর্ষণ করেছে। তারা তাদের নাগরিক জীবনের জিগীষাকেই যেন খুঁজে পেয়েছেন সেই সব কাজে।

তবে প্রদর্শনীর অন্তর্নিহিত সুর হিসেবে সব কাজেই ছিল রঙের ব্যাপক প্রাচুর্য। ফিলিপিনো সমাজের বিভিন্ন স্তরের দর্শক, কূটনীতিক, প্রবাসী বাংলাদেশি এবং সমঝদার বোদ্ধা-দর্শকদের সেই রং, তার আনন্দ ও সৌর্ন্দয দিয়ে মুগ্ধ করেছে। তারা নতুন করে আবিষ্কার করেছেন বাংলাদেশকে, তার শিল্পকে, তার অন্তর্লীন রংকে।