কাঁথায় লেপে রঙের বাহার

শিল্পের পথ বড় বিচিত্র, বিপুল তার বৈভব। অন্যরকম এক বৈচিত্র্যের সন্ধান পেলাম ঢাকার ধানমন্ডির তাজ-লিলি গার্ডেনের ১২ তলায় গ্যালারি ২১ এ শিল্পী জাহান আফরোজ রুবার প্রদর্শনীতে। সাধারণ আটপৌরে বাঙালি গৃহবধূদের শিল্পিত অনুভূতি প্রকাশের বাহন কাঁথাশিল্প বাংলা সংস্কৃতির আবহমান ঐতিহ্যের স্মারক হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশি আমেরিকান শিল্পী রুবা তাঁর শিকড় হতে ধারণা নিয়ে কাঁথাশিল্পকে আধুনিক রূপ দিতে চেয়েছেন। সেই রূপের সন্ধানে গত ৬ জানুয়ারি হাজির হয়েছিলাম গ্যালারিতে। দেখতে পেলাম উন্নত বুননে বাহারি নকশা ও রঙের মনোহর বস্ত্রখ- যোগ করে প্রয়োজনে তার ওপর এঁকে হাতে সেলাই দিয়ে অনেকগুলো আধুনিক কাঁথা তৈরি করেছেন শিল্পী। কাজগুলো ২০১৪ থেকে ২০১৬ তে করা।

জাহান আফরোজ রুবা ১৯৮১ সালে ঢাকার তৎকালীন চারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও ১৯৮৩ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। পরে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। এখন বাস করছেন ওয়াশিংটন ডিসির নিকটবর্তী শহর মেরিল্যান্ডে। সেখানে শিল্পিত মানের নকশিকাঁথা-কম্বল তৈরিতে তাঁর শিল্পশিক্ষা কাজে লাগাতে একটি ওয়ার্কশপ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। কুটিরশিল্পের প্রযুক্তি প্রয়োগ করে তাঁতশিল্পীরা যেমন সুতো টান টান করে তাঁতে উঠিয়ে বুনন করেন, তারই অনুকরণে ঘরের ভেতর একধরনের টেবিলে শিল্পী রুবা ও তাঁর সহযোগীরা হ্যান্ডপেইন্ট কিংবা বুননের কাজ করেন। শিল্পীর হাতে পড়ে ইন্ডাস্ট্রিয়াল শিল্প যে সৃজনশিল্পীর নিরীক্ষামূলক শিল্পকর্মের উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে, তার প্রমাণ আমরা অনেক পেয়েছি। এ ক্ষেত্রেও তা পাওয়া গেল।

একটি প্রদর্শনীর সফল আয়োজনে অনেক কিছুর সমন্বয় প্রয়োজন। শিল্পী জাহান আফরোজ রুবার সহপাঠী শিল্পী সৈয়দ হাসান মাহমুদ এ প্রদর্শনীর কিউরেটর হিসেবে এই কাজগুলোকে গুছিয়ে দিয়েছেন। এ ছাড়া গ্যালারির জায়গাকে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে প্রদর্শনীকে দর্শক-বোদ্ধার কাছে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করেছেন তিনি। প্রদর্শনীর দৃষ্টিনন্দন রঙিন ব্রোশিওর নকশা করেছে আর্টকন।

ব্রোশিওরে শিল্পী নিজের কথায় উদ্ধৃত করেছেন তাঁর শিল্পের আদর্শ বরেণ্য শিল্পী জর্জিয়া ও’কিফির বলায় - ‘আমি নিজেকে বলেছিলাম আমি আঁকব, যা আমি দেখি। পুষ্প আমার কাছে কি - আমি তাকে আঁকি বৃহৎ পরিসরে এবং সময়কে এর ভেতরে দেখে তারা বিস্মিত হয়।’ এরপর রুবা লিখেছেন, আমি ভালোবাসি ফুল ও পাতা, যা নিসর্গের সত্যিকারের সম্পদ এবং শিল্পের সব ফর্মের ভিত্তি।

শিল্পীর কাজ নিয়ে ব্রোশিওরে লিখেছেন - গত এক যুগ ধরে শিল্পী রুবার সৃজনকর্মের সঙ্গে সুপরিচিত মার্কিন কাঁথাশিল্পী জ্যাকি নেলসন। তাঁর লেখায় আমরা জানতে পারছি - মাত্র তিন বছর আগে রুবা কাঁথাশিল্পে হাত লাগান। তিনি আরও বলছেন - ‘আমি দীর্ঘকাল দৃষ্টিনন্দন কাঁথা বুনি এর ব্যবহার উপযোগিতা নিয়ে। তবে আমি আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করলাম রুবা কাঁথা বুনছেন একেকটি শিল্পকর্ম হিসেবে। বেসিক ফর্মকে পুনর্বিন্যাস করে শিল্পিত কায়দায় তুলে ধরেছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর এত দ্রুত দক্ষতা অর্জন আমাকে বিস্মিত করেছে।’

প্রদর্শনীতে দেখা গেছে, গ্রে রঙের উলেন ফেব্রিকের এক পাশে লাল হলুদ কমলা আর কালচে লাল বস্ত্রখ- সেলাই দিয়ে জুড়ে আলোছায়াময় চমৎকার এক পপি ফুল এঁকেছেন শিল্পী। প্যালেটের রং দিয়ে চিত্রপটে রং চাপানোর কায়দায় কাছাকাছি রঙের মিশেলে করা মনোহর কাজ যেন!

আরেকটি কাঁথার সেলাই করা ধূসর জমিনে দেখা গেল তিনটি লম্বা গাছের ফাঁক দিয়ে দূরের ভ্যাংকুভার দ্বীপের পাহাড়ি আভাসসহ এক প্রকৃতিচিত্র। ক্যাকটাসের পাতা-কাঁটা ও ফুল নিয়ে সবুজাভ জমিনে জলরংসদৃশ স্নিগ্ধতায় চমৎকার এক ছবি গড়েছেন শিল্পী। এর শিরোনাম - প্রিকলি পিয়ার ক্যাকটাস।

কাদামাটির বুকে হাতের মানুষের স্পর্শে যেমন নানা রকম ইফেক্ট তৈরি হয় স্যাপগ্রিনের তেমন টেক্সচারের বুকে ইরিজেস নামে আরেকটি ফুলেল চয়ন দেখা গেল। এটিও একটি শিল্পিত কাজ। জ্যামিতিক ফর্ম ও রিপিটেশন নিয়েও শিল্পী কতক দৃষ্টিনন্দন কম্পোজিশন তৈরি করেছেন। শিল্পী এসবের নাম দিয়েছেন স্টার পাজল, ওয়ান ফেব্রিক ওয়ান্ডার, বার্ডস ইন পার্পল, ফেদারড ফ্রেন্ডস প্রভৃতি।

আবার জ্যামিতিক ফর্মের রিপিটেশনের মধ্যেই শিল্পী রুবা ফুল-পাখি-পাখির নীড়-লতা-পাতা- বিড়ালের ছবি সংযুক্ত করে পটকে মজাদার ও প্রাণবন্ত করে তুলেছেন। ব্যবহারিক উপযোগিতা আছে এমন কাঁথা-কম্বলে শিল্পের সুরুচি ও মননশীলতা যোগ করে শিল্পী তাকে দৃষ্টিসুখদায়ক করেছেন এবং একই সঙ্গে তাকে দৃশ্যশিল্পের মর্যাদায় তুলে এনেছেন। ঠিক এখানেই শিল্পী জাহান আফরোজ রুবার

সৃষ্টির সার্থকতা।