তেল, জল আর রঙের গল্প

‘আকাশ, জল, কাদা ও আমরা’- নামই বলে দিচ্ছে এই কর্মযজ্ঞের মূলে আছে প্রকৃতি। ৯ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী চলে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এই শৈল্পিক কর্মকা-ের মধ্য দিয়ে ৩৮ জন তরুণ শিল্পী ইট-পাথরের এই শহরে, সফেদ ক্যানভাসে তুলে এনেছেন টুকরো টুকরো মেঘ, জলস্রোত আর সবুজ পাতা।

বেশির ভাগ শিল্পকর্মেই শিল্পীর স্বকীয়তা লক্ষণীয়। বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য শিল্পীদের অনেককেই তাঁদের পরিচিত বিষয়-ভাবনার চক্র থেকে বের করে এনেছে। কাছাকাছি বিষয়বস্তু হওয়া সত্ত্বেও শিল্পীদের দর্শনভেদে শিল্পকর্ম ভিন্ন রূপে দর্শকের চোখে ধরা পড়ে।

গ্যালারিতে ঢুকেই চোখে পড়ে মো. খাইরুল হাসানের চিত্রকর্ম। চিত্রকর্মগুলো যেন শুরুতেই চোখে কুয়াশার কাজল পরিয়ে দেয় অথচ আলো-ছায়ার খেলাই বলে দেয় কোনো রোদ ঝলসানো দুপুরকে বর্ণনা করছেন শিল্পী। একদিকে খাইরুল যখন শুভ্র রোদের প্রশান্তিময় রূপ দেখাচ্ছেন, তখন রুমানা জাহান রূপা দেখাচ্ছেন সোনা-গোলা হলদে রোদ। এই শিল্পী তার জলরঙের ছোঁয়ায় ঝকমকে রোদের মধ্যেও জীর্ণতা, প্রকৃতির ক্ষয়িষ্ণু পরিণতি ফুটিয়ে তুলেছেন। যেন লুকিয়ে রাখা পুরোনো হঠাৎ করে খুঁজে পাওয়া। পুরোনো, তবু কি পুরোনো?

মানিক বণিক জলরঙের পরশে স্থির ছবিতেও গাঙচিলকে দিয়েছেন প্রাণের ছটফট।

অন্যদিকে জুয়েল এ রব তাঁর তেলরঙের পুরু পরতে পরতে উজ্জ্বল নীল আর লালের শেড মিশিয়ে গড়ে তুলেছেন রূপকথার ঘন জঙ্গল, তার ওপর হালকা রঙের ছোপ গহিন বনে পৌঁছানো স্বল্প কিন্তু তীব্র আলো-ছায়ার খেলাকেই শিল্পী বন্দি করেছেন তাঁর ক্যানভাসে। শিপ্রা বিশ্বাস ও মো. আজমল হোসেন তেলরঙকে মাধ্যম করে গ্রাম-বাংলার নির্মেঘ নীল আকাশকে তুলে এনেছেন গ্যালারির নিস্তরঙ্গ দেয়ালে, যা দর্শকের মনে শিকড়ের সুর উত্তাল তরঙ্গে বাজিয়ে তোলে। যদিও শিল্পী আজমলের কাজে ভ্যানগঘের শিল্পশৈলীর প্রভাব প্রবলভাবে ধরা পড়ে (শিল্পীজীবনের এই সময়ে কিংবদন্তিদের প্রভাব অভূতপূর্ব নয়, পরিণত সময়ে নিশ্চয়ই তিনি নিজস্ব মৌলিক ঘরানাকে রূপ দিতে সক্ষম হবেন)।

জান্নাতুন নাহার আভা অবশ্য নিজের একটি শৈলী তুলে ধরেছেন। কিছুটা ভ্যানগঘীয় টেকশ্চারে আঁকা মনে হলেও শিল্পী একটি পার্থক্য বজায় রেখেছেন, যা শিল্পীকে মৌলিকতা এনে দিয়েছে। ভ্যানগঘ টেকশ্চারগুলো নির্দিষ্ট আকৃতি বা দিকের নির্দেশনা অনুযায়ী সাজাতেন। কিন্তু এই তরুণ শিল্পীর তুলির আঁচড় ছুটে চলছে দিক্বিদিক। আর রঙের যে খেলা তার ক্যানভাসে উঠে এসেছে, তা চোখকে বলে ফিরে ফিরে দেখতে।

প্রকৃতি থেকে প্রায়ই আমরা নিজেদের মানে মানুষকে আলাদা করে ফেলি, যদিও মানুষ প্রকৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর সেই উপলব্ধি আমরা আঁখিনুর বিনতে আলী চিত্রকর্মের মধ্য দিয়ে দেখতে পাই।

প্রযুক্তি যখন প্রকৃতিপ্রদত্ত চোখ দিয়ে দেখার আগেই দৃশ্যটি মুঠোফোনের মুঠোয় পুরে দেবার চলের সঙ্গে তাল মেলাতে বলে, তখন আরিফা সুলতানার কাজ দেখে মন ঠিক আশ্বস্ত হতে পারে না, শিল্পীর চোখের ভালো লাগাটাকে দেখলাম তো? যদি শিল্পী দেখাকে মনে ধরে রেখে এই প্রতিরূপ দিয়ে থাকেন, তবে তা অবশ্যই প্রশংসনীয়।

এ ছাড়া বেশির ভাগ কাজেই শিল্পীদের নিজেকে ব্যক্ত করার প্রচেষ্টা, নিজস্ব শিল্প ঘরানা তৈরির প্রাথমিক কিন্তু দৃঢ় পদক্ষেপ উপলব্ধি করা যায়।

কিন্তু এ সবকিছু ছাপিয়ে গেছে বেশির ভাগ শিল্পীর পরম সংশ্লিষ্টতা ও একাগ্রতা। আর তাই অবশ্যই এই মেধাবী

শিল্পীরা বাংলাদেশের শিল্পকলার ইতিহাসকে ঐশ্বর্যময় করে তুলবেন।