ঢাকায় ভারতের দুই তরুণ শিল্পীর পদশনী

সম্প্রতি ঢাকায় প্রদর্শনী করতে এসেছিলেন ভারতের তরুণ দুজন চিত্রকর - শিল্পী জয়ন্ত খান ও রাজিব সরকার। প্রথমজন কলকাতার শিল্পী, দ্বিতীয়জন ঝাড়খন্ডনিবাসী শিল্পী। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সাধারণ পথ বদলে তাঁরা চারুশিল্পের পথে হাঁটছেন অনেক দিন থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারি-১-এ শিল্পী জয়ন্ত খানের সাতটি চিত্রকর্ম ও গ্যালারি-২-এ শিল্পী রাজিব সরকারের পনেরোটি চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছে।

এ দুই সতীর্থশিল্পী ছবি আঁকেন সমাজ বাস্তবতা নিয়ে। তবে দুজনের মধ্যে এটুকুই মিল - কাজ ভিন্ন ধরনের। চলমান সময়ে আমাদের চোখের সামনে যা ঘটছে, শিল্পী জয়ন্ত খান সেগুলোকে তুলে ধরেছেন সরাসরি ব্যঙ্গাত্মকভাবে নানা প্রতীকের আশ্রয় নিয়ে। অপরদিকে রাজিব বাস্তবতার কাছাকাছি থেকে সময়ের পরিবর্তনকে তুলে ধরেন নানা উপাদান প্রয়োগ করে।

শিল্পী জয়ন্ত খানের বেশির ভাগ কাজই বড় আকৃতির ক্যানভাসে আঁকা। শিল্পী এগুলো এঁকেছেন তেলরং, অ্যাক্রিলিক ও মিশ্র মাধ্যমে। তাঁর চিত্রকর্মগুলোর গঠন ও উপস্থাপনায় একধরনের সোশ্যাল-ফ্যান্টাসি-আক্রান্ত বলে মনে হয়েছে আমার কাছে। সুররিয়ালিজমের ভাবধারাও বর্তমান তাঁর একাধিক কাজে। সব মিলিয়ে মানুষের মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, সমাজে অশুভ শক্তির দাপট, অকল্যাণ-অমঙ্গলে ভরপুর দিনযাপনের নানা অনুষঙ্গ উঠে এসেছে তাঁর একেকটি চিত্রকর্মে। আবার সামাজিক মানুষেরা যে আজ সোশ্যাল মিডিয়াজ্বরে আক্রান্ত, সেদিকটাও শিল্পী এড়িয়ে যাননি।

তাঁর আরেকটি চিত্রে দেখা গেছে ক্যানভাসের নিচের জমিনে বহুতল ভবনের সারি। তার ওপরে আকাশে সারস পাখি এক ছাগশাবকের মাথায় বসে ওর মুখের দিকে গন্ধরাজ ফুল ধরে আছে। চলমান বাস্তবতার নিষ্ঠুরচিত্রকে রূপকথার গল্পের ছবির মতো করে তুলে ধরেছেন শিল্পী। আরেকটি চিত্রে দেখা গেছে, এক সাধু প্রকৃতিতে মিশে গেছেন, শুধু তার খোলসটুকু যেন দৃশ্যমান। তার ব্যবহার্য ত্রিশূল যেন বৃক্ষে রূপান্তরিত হয়েছে। কাছাকাছি আরেকটি চিত্রে দেখেছি ভারতীয় তান্ত্রিকতার সঙ্গে এ যুগের প্রযুক্তিনির্ভর নানা উপাদান ও অ্যাপসের প্রতীকগুলোকে উপস্থাপন করেছেন শিল্পী জয়ন্ত খান। আধুনিক মানুষের জীবনযাপনের ধরন যে ক্রমান্বয়ে বদলে যাচ্ছে, সেটি নানা প্রতীকের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন জয়ন্ত খান।

তাঁর একটি চিত্রকর্মে আমরা দেখতে পাই - আকাশশূন্যে তোলা এক দাবার কোর্টে মুমূর্ষু এক সারমেয়, সেটি যেন বেঁচে আছে ফেসবুক, ব্লু-টুথসহ নানা অ্যাপসের স্যালাইন-ডোজে। মধ্যবিত্তের সব সামাজিকতা বাস্তবের শ্বাস-প্রশ্বাস পেরিয়ে আজ মাথা কুটছে অন্তর্জালের মায়ার কুহকে। ইন্টারনেটের শক্তি আসক্তির পর্যায়ে গেলে তার পরিণতি কী হতে পারে, সে সম্পর্কে শিল্পী তাঁর অনুমানটুকু মজাদারভাবে তুলে ধরেছেন।

শিল্পী রাজিব সরকার অনেকটা পরিশীলিত তাঁর অনুভূতি প্রকাশে। দ্বিমাত্রিক আঁকার ধরন তাঁর, বর্ণিলতায় লোকশিল্পীর ঔদার্য। প্রাথমিক নানা রঙের আতিশয্য যেমন তাঁর চিত্রপটে, তেমনি কিছু কাজে বর্ণ মেশানো প্রলেপও লক্ষ করা গেছে। স্বাভাবিক সৌন্দর্যের বিকাশ থেকে তিনি দর্শকের দৃষ্টি ফেরান অন্য এক ধরনের রূপান্তরের প্রতি। যেমন - সুশোভিত ফুল ও পাতার বিন্যাস দেখতে দেখতে দর্শক আবিষ্কার করেন, ফুলদানিটা যেন মানব অবয়ব ধারণ করেছে।

বাস্তবতার মধ্যে যেমন আমাদের চিন্তায় অকস্মাৎ ফ্যান্টাসি ঢুকে পড়ে, মানুষের সেই মনোভাবটিকে শিল্পীর অনুভব দিয়ে সেই বোধকে শিল্পশোভনভাবে তুলে ধরেছেন। ফুলের মতো রঙচঙে মানুষকে সাজিয়েছেন বলে ফুল আর মানুষ একাকার হয়ে গেছে। আবার মানুষের অবয়ব আঁকতে আঁকতে ক্রমাগত মুখ যেন মুখোশে রূপান্তরিত হয়েছে তাঁর হাতে। এই কাজের পশ্চাৎপটে অনেক ইংরেজি বর্ণমালার গঠন যেন মুখোশের অন্তরালে ভাষার সংকেতকে তুলে ধরেছে।

দুটি ভিন্নমাত্রার কাজ করেছেন শিল্পী রাজিব সরকার। একটিতে সাদাকালোয় মোনালিসাকে উপস্থাপন করেছেন। এর শিরোনাম ‘সাদাকালোয় মোনালিসা’। অন্যটিতে শিল্পী কম্যুনিস্ট বিপ্লবের মহান নেতা লেনিনকে তুলে ধরেছেন লাল ও কালো বর্ণের আলিম্পনে। এ চিত্রের শিরোনাম - ‘লালের পেছনে’। পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকা বামদের আদর্শ-নেতৃত্বকে শিল্পী তুলে ধরেছেন ভিন্ন আঙ্গিকে। ইউরোপীয় রেনেসাঁর মহান শিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির জগদ্বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘মোনালিসা’ নিয়ে শিল্পী-দর্শকদের আগ্রহের খামতি নেই। রঙিন মোনালিসাকে সাদাকালোয় কেমন লাগে - এমন ভাবনাকে সঙ্গী করে রাজিব এই নিরীক্ষা করেছেন।

চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারিতে ১৭ ডিসেম্বর শুরু হয়ে এ প্রদর্শনী চলে ২৩ ডিসেম্বর ২০১৬ পর্যন্ত।