এসো হে বৈশাখ

প্রাক্কথন : জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক

এই মিছিল আনন্দের। এই মিছিল উৎসবের। শুধুই কি আনন্দের? শুধুই কি উৎসবের? না, শুধুই আনন্দের না। শুধুই উৎসবের না। এর সাথে মিশে থাকে আমাদের সংস্কৃতি, নিজস্ব ঐতিহ্য। গ্রামের প্রায় হারিয়ে যাওয়া কিস্সা পালার হাতি-ঘোড়া, অতি পুরাতন কোনো লোকনৃত্যে ব্যবহৃত মুখোশ, গ্রামীণ গৃহসজ্জার শোলার পাখি - সব উঠে এসেছে এখানে। আর নতুন বছরের নতুন আলোয় রোদের রঙে সেজেছে সকল মানুষ। তার পর একসাথে মিলে যায় সব। তারপর মিছিল হয়ে যায় রঙের বন্যা। লাল, নীল, হলুদ, কমলা, সবুজের বন্যা ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চায় সকল জীর্ণতার কূপম-ূকতাকে। তারুণ্যের জোয়ার বইতে থাকে তখন। তারুণ্য তখন সমগ্র শহর জুড়ে ঢেউয়ের মতো নাচতে থাকে। বয়সের কোনো সীমাও বাধা দিতে পারে না এই তারুণ্যকে। এখানে সবাই তরুণ। এই তারুণ্য ভীষণ বাঙালি। কি পোশাকে, কি আচরণে, কি চেতনায়, কি প্রবণতায় আজ সবাই বাঙালি। আগের রাত থেকে কিংবা তারও আগে থেকেই চলে এর মানসিক প্রস্তুতি। আর যারা আয়োজন করেছে এই মিছিলের, তাদের তো রাত নেই, দিন নেই, ঘুম নেই, ক্লান্তি নেই। শুধু কাজ আর কাজ, সেই কবে থেকেই। তাদের এই পরিশ্রমের ঘামটুকুও আনন্দ হয়ে যায়। ছড়িয়ে যায় মিছিলের সবার মধ্যে।

বাঙালির নববর্ষে এখন প্রতিবারই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের আয়োজনে বের হয় এমন শোভাযাত্রা। আয়োজনে সহযোগিতা করেন অনেকেই। অংশগ্রহণ করে সর্বস্তরের মানুষ। এর মূল অংশ তরুণেরা হলেও বাদ পড়ে না কোনো বয়সের কোনো স্তরের মানুষ। প্রতিবছরের এই আয়োজন এখন আমাদের নববর্ষ উদ্যাপনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, সংস্কৃতির অংশ - যে সংস্কৃতি মানুষের তারুণ্যকে বাঁচিয়ে রাখে। আবার সেই তারুণ্য সমস্ত চেতনা দিয়ে উপলব্ধি করতে চায় তার বাঙালি অস্তিত্বকে। প্রাণ ভরে গ্রহণ করতে চায় বাঙালিত্বের সকল স্বাদ।

বর্ষবরণ ও চারুকলার শোভাযাত্রা : উৎসের কথা

বর্ষবরণ বাংলাদেশের বহু পুরোনো আচার। তবে এটি প্রধানত গ্রামাঞ্চলে এবং বিশেষ বিশেষ শ্রেণির ও পেশার মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। যেমন ব্যবসায়ীদের হালখাতা, পুণ্যাহ ইত্যাদি। মূলত ভাষা আন্দোলনের হাত ধরে পঞ্চাশের দশকে বিভিন্ন শহরে অসাম্প্রদায়িক ও সর্বজনীন রূপে বাংলা নববর্ষের উৎসব উদ্যাপন শুরু হয়। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার সে সময় ধর্ম ও উর্দুভিত্তিক এক বিদ্ঘুটে সংস্কৃতি সবার ওপর চাপিয়ে সব কিছু পাকিস্তানীকরণের বীভৎস প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। ভাষা আন্দোলনের পর বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই এসবের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালানো হয়। এই আন্দোলন বাঙালি সংস্কৃতির স্বকীয় সত্তাকে বাঁচিয়ে রাখার আন্দোলন। তাই সূচনাপর্বেই এই উদ্যোগ পাকিস্তানি সরকার ও তার এদেশীয় সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক দোসরদের প্রবল আক্রমণের মুখে পড়ে। বাঙালি সংস্কৃতির এই নতুন বিন্যাস ও বিকাশ প্রক্রিয়াকে ‘হিন্দুয়ানি’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এই বিরুদ্ধতার চাপে আয়োজন আরও দানা বাঁধে। ষাটের দশকে ছায়ানটের উদ্যোগে রমনার বটমূলে শুরু হয় বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। আয়োজনের প্রধান বিষয়, রবীন্দ্রসঙ্গীত, যা তৎকালীন পাকিস্তান সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। অনুষ্ঠানটি বাঙালি নাগরিক মধ্যবিত্তের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। ঢাকায় নববর্ষের প্রধান অনুষ্ঠান হয়ে যায় এটি। চলতে থাকে নিয়মিত। পঁচাত্তরের পর দেশে আবার সাম্প্রদায়িক অপশক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করে। তখন এই আয়োজন আবার নতুন করে প্রতিবাদী চরিত্র পায়। বর্ষবরণের ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়েই আশির দশকে শুরু হয় চারুকলার আয়োজন - বর্ণাঢ্য মাঙ্গলিক শোভাযাত্রা।

উদ্দেশ্য : ঐতিহ্যের উৎসবে মিলুক সবাই

মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজনের উদ্দেশ্য হচ্ছে, সকলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে উৎসবের রূপটিকে সর্বজনীন করা। যে উৎসবে কেউ দর্শক-শ্রোতা নয়, বরং সবাই সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। আদি উৎসবসমূহ, যেমন নবান্ন, চৈত্রসংক্রান্তি, মহররম, সাঁওতাল উৎসব - এসবে যে রকম ঘটে থাকে। তবে প্রাচীন আমলের সামন্তদের মঙ্গলঘট বহন বা অভিষেকের শোভাযাত্রার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। বরং এর উদ্দেশ্য বর্ষবরণকে জনসম্পৃক্ত করা। বাঙালি সংস্কৃতি ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে উৎসব-অনুভূতি যেন সবাই পায়। সবাই যেন নাচতে পারে, প্রায় সবাই যেন শোভাযাত্রা সজ্জা-সামগ্রীর কোনো একটি অন্তত বহন করতে পারে। এই আয়োজন সবাই মিলে সম্মিলিতভাবে অংশগ্রহণ করার মতো আনন্দের আয়োজন।

এই শোভাযাত্রার মাধ্যমে বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে তুলে ধরা হয়। সবাইকে মনে করিয়ে দেওয়া হয় নিজস্ব গৌরবময় অস্তিত্বের কথা। পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় লোক-অনুষঙ্গসমূহের সঙ্গে যাতে অনুভূতি তৈরি হয় শহুরে মানুষদের। তাই উৎসবের আয়োজনে এটি একটি আন্দোলন, সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের সময়ে আমাদের নিজেদের দিকে তাকানোর তাগিদ।

প্রতিবছরই শোভাযাত্রার একটি স্লোগান থাকে। স্লোগানসমূহের মাধ্যমে ফলপ্রসূভাবে আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যকে প্রতিষ্ঠিত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। সব ধরনের ধর্মীয় সংস্কৃতির বাইরে শাশ্বত সর্বজনীন বাঙালি সংস্কৃতির বিশালতা ঘটানোর প্রত্যয় থাকে এই শোভাযাত্রায়। এই প্রত্যয় সকল সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা ও মৌলবাদী অন্ধকারের বিরুদ্ধে অযুত প্রাণের ঘর্ষণে দারুণ আগুন জ্বালে।

প্রথম উদ্যোগ : কতিপয় থেকে অসংখ্যে যাত্রা

চারুকলা ইনস্টিটিউটের ছাত্ররা এবং কতিপয় শিক্ষক ঢাকায় সম্মিলিত অংশগ্রহণমূলক একটি শোভাযাত্রা আয়োজনের কথা ভাবেন।

’৮৭তে জয়নুল উৎসবে প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটি পরীক্ষামূলক শোভাযাত্রা করা হয়। এই শোভাযাত্রায় ছিল চারটি মাত্র ঘোড়া, ২০/২৫টি মুখোশ আর কিছু ঢোল। এতেই ব্যাপক সাড়া পাওয়া যায়। সাধারণ ছাত্ররাও মিশে যায় এর সঙ্গে। এ থেকেই জন্ম উৎসাহের। এবং ’৮৮ সালে (বাংলা ১৩৯৪) প্রথম নববর্ষের শোভাযাত্রা বের করা হয়। আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে যে প্রতিবাদী পরিবেশের একটা গভীর সম্পর্ক রয়েছে, এ ক্ষেত্রেও তার প্রমাণ মিলল। তখন দেশব্যাপী চলছিল স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন। এই শোভাযাত্রা স্বৈরাচার ও তার হাত-ধরে-চলা মৌলবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাল।

প্রথম চারুকলা ইনস্টিটিউটের এক শ থেকে দেড় শ জন ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে শোভাযাত্রা শুরু করা হয়। সেই মিছিল শাহবাগ হয়ে সড়ক ভবন অতিক্রম করার পর দেখা গেল, প্রায় ১০ হাজার লোক শামিল হয়েছে মিছিলে। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সংস্কৃতি কর্মীরাসহ সর্বস্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করল এতে। শোভাযাত্রার শুরুতে ৪০টি ঢাককে মনে করা হয়েছিল অনেক বেশি। পর মনে হলো, তা তো নয়। মিছিলে ব্যবহৃত হলো মুখোশ, শোলার পাখি ইত্যাদি লোকজ অনুষঙ্গ। প্রধান আকর্ষণ ছিল বড় আকারে বানানো হাতি ও ঘোড়া।

ঢাকে বাড়ি দিয়ে শোভাযাত্রা উদ্বোধন করেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের তৎকালীন আহ্বায়ক কবি-সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটসহ আয়োজনে সহযোগিতা করেছেন এম আর আখতার মুকুল, মামুনুর রশীদ, আসাদুজ্জামান নূর, নাজমা আনোয়ার প্রমুখ।

এরপর থেকেই যথেষ্ট উৎসাহ পাওয়া যায়। প্রতিবছর শোভাযাত্রা করার পরিকল্পনা গৃহীত হয়। সংগ্রাম ও ইনকিলাব পত্রিকা এর বিরুদ্ধে লেখালেখি করে। এই ঘটনা উৎসাহের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।

সমস্যা যে কিছু ছিল না একবারে, তা-ও নয়। প্রথম দিকে অসহনীয় অর্থকষ্ট ছিল আয়োজকদের মধ্যে, কিছু শঙ্কাও ছিল। কারণ, সে সময় ছিল রোজার মাস। তার ওপর শোভাযাত্রায় বিভিন্ন অনুকৃতি ব্যবহারের ব্যাপার থেকে মৌলবাদীরা সুযোগ নিতে পারে এমন আশঙ্কাও ছিল; এবং তারা সাধারণ মানুষের কাছে বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাব, ‘হিন্দুয়ানি’, এসব বলে অপপ্রচার চালাতে পারে, এই দুশ্চিন্তাও ছিল। আবার সাধারণ মানুষই-বা কীভাবে নেবে - এসব ভাবনাও ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত প্রবল জনসম্পৃক্ততা, চারুকলার শিক্ষকবৃন্দসহ বিপুলসংখ্যক সুধীজনের উৎফুল্ল সমর্থন ও স্বীকৃতি সব বাধা দূর করে দিয়েছে।

শোভাযাত্রার ধরন : কার্নিভাল, গেঁয়ো সুর ভেসে বেড়ায় শহুরে হাওয়ায়

শোভাযাত্রার সাজসজ্জায় প্রধানত মানুষের পরিচিত লোক-অনুষঙ্গসমূহ ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে শোলার পাখি, ময়ূর, মুখোশ, চৈত্রসংক্রান্তির পালাগান ও গ্রামের কিস্সা পালাসমূহে ব্যবহৃত হাতি-ঘোড়ার অনুকৃতি। মেলায় ব্যবহৃত কাঠের হাতির অনুকৃতি, দারুশিল্পের কাঠের বাঘের অনুকৃতি। গ্রামীণ মেলার খেলনা, সাপের অনুকৃতি, গ্রামীণ গৃহসজ্জায় ব্যবহৃত কাগজের ফুলের অনুকৃতি, বানর, প্যাঁচার সং, মোরগের অনুকৃতি ইত্যাদি। উল্লেখ্য, গ্রামে প্রচলিত বুড়োবুড়ির মুখোশ-নাচ, তালপুবেড়ে, এসব থেকে মুখোশের অনুকৃতিসমূহ নেওয়া হয়। এবং সকল অনুকৃতিই বেশ বড় আকারে তৈরি করা হয়। এসব উপাদান শোভাযাত্রা ও নববর্ষ উৎসবকে শুধু বিচিত্র বর্ণে বর্ণাঢ্যই করে না, বরং সব রকম ভ-ামির বিরুদ্ধে মোক্ষম প্রতিবাদও জানায়।

শোভাযাত্রা শুরু হয় সকালে। এতে ঢাকঢোল বাজানো হয়। এই বাদ্যের সঙ্গে অংশগ্রহণকারীরা সবাই নাচে। নাচতে নাচতে শহর প্রদক্ষিণ করে। নাচের পেছনে দর্শন হচ্ছে, অমঙ্গল দূর করা।

শোভাযাত্রায় কোনো দলীয় রাজনৈতিক স্লোগান ব্যবহার করা হয় না। আয়োজনের ক্ষেত্রেও কোনো দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব থাকে না। উল্লেখ্য, মহররমের মিছিল ছাড়া এটাকেই দেশের একমাত্র কার্নিভাল বলা যায়।

ক্রমাগত দীর্ঘায়মান মিছিল : দেশব্যাপী তারুণ্যের উৎসব

ঢাকায় নববর্ষের এই শোভাযাত্রায় মানুষের অংশগ্রহণ অনেক বেড়েছে এবং দিনের পর দিন বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে আয়োজনের কলেবরও। টুকরো টুকরো আয়োজনগুলো সমন্বিত হয়েছে। এবং এটি এখন আর নিছক স্বতঃস্ফূর্ত আবেগের ব্যাপার নয়। এই শোভাযাত্রা এখন একটি প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। ঢাকায় এখন বিভিন্ন সংগঠন থেকে পাড়া-মহল্লা থেকে ছোট-বড় শোভাযাত্রা বের করা হয়। সেগুলোর অধিকাংশই আবার চারুকলার শোভাযাত্রার সঙ্গে এসে যুক্ত হয়। এর ফলে এই শোভাযাত্রাটির আকার আরও বেড়ে যায়। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, বেতার-টেলিভিশন শিল্পী সংসদ এবং বিভিন্ন সংগঠন এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এর আয়োজনে সহযোগিতা করেন। চারুকলার এক ঝাঁক উদ্যমী তারুণ্যের দিন-রাত শ্রম, মেধা, শিক্ষকদের উৎসাহ সব মিলে প্রতিবছর কোনো না কোনো ভিন্ন মাত্রায় সাজে শোভাযাত্রাটি। দেশের বিভিন্ন মফস্বল শহরেও আয়োজিত হয় এমন শোভাযাত্রা। চারুকলার ছেলেরাই অনেক ক্ষেত্রে তাদের নিজেদের শহরে প্রচলন করেছে এই আয়োজনের। অবশ্য এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করা দরকার, যশোরে চারুপীঠের উদ্যোগে এমন বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেদিক থেকে যশোর আমাদের পথিকৃৎ। শোভাযাত্রা এখন নববর্ষ উৎসবে তারুণ্যের অপরিহার্য আয়োজন।

আয়োজকদের কয়েকজন : সমস্যা ও আশার কথা

কথা হলো শোভাযাত্রা-আয়োজকদের কয়েকজনের সঙ্গে। এর মধ্যে কয়েকজন শুরু থেকে আজ পর্যন্ত সক্রিয়ভাবে জড়িত। কয়েকজন আবার নতুন। যাঁদের সঙ্গে কথা হলো তাঁরা হচ্ছেন চারুকলার শিক্ষক রফিকুন নবী (রনবী), আবুল বারক আলভী, শিল্পী ইমদাদ হোসেন, কামাল পাশা চৌধুরী, সাখাওয়াত হোসেন মিঠু, চারুকলার বর্তমান ছাত্র সালাম তৌফিক, পিপলু মাহবুব, লিটন, মিমি, শান্তা ও রানা।

রফিকুন নবী বলেন, আমাদের বাঙালি জাতিসত্তাকে টিকিয়ে রাখার জন্যই নববর্ষ উৎসব এবং এ ধরনের শোভাযাত্রা অব্যাহতভাবে আয়োজনের প্রয়োজন আছে। এটি আরও আগে থেকেই করা উচিত ছিল। আবুল বারক আলভী বলেন, আমাদের তারুণ্যকে সমাজ-জীবন-বিচ্ছিন্ন অপসংস্কৃতির আগ্রাসন থেকে রক্ষা করার জন্যই এই আয়োজন আরও জোরদারভাবে করা উচিত। তাহলে এটি আমাদের ঐতিহ্যকে সত্যি সত্যিই ফলপ্রসূভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। ইমদাদ হোসেন বললেন, নববর্ষ উৎসব আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। নববর্ষের শোভাযাত্রা অনিবার্যভাবেই তাই আমাদের সাংস্কৃতিক কার্যক্রম। এর মাধ্যমে আমরা সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা ও কুসংস্কারের ঊর্ধ্বে উঠে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বাড়াতে পারি। এভাবে এগিয়ে যেতে পারি সাংস্কৃতিক বিকাশের দিকে। কামাল পাশা চৌধুরী বলেন, তারুণ্যের এই শোভাযাত্রা আবহমান বাঙালি সংস্কৃতির ধারাবাহিকতার অনিবার্য ফসল। একে ধরে রাখতে হবে আরও সমৃদ্ধ করতে হবে। আরও ফলপ্রসূ করতে হবে। ছাত্র-ছাত্রীরা বললেন ঐতিহ্যটিকে ধরে রাখার জন্যেই শোভাযাত্রাটি করি। এটি মহা আনন্দের। সবারই আনন্দটাকে ধরে রাখা উচিত। আশা করা যায়, দিনে দিনে এতে সবার অংশগ্রহণ আরও স্বতঃস্ফূর্ত হবে। শোভাযাত্রা আরও আনন্দময়, আরও অর্থবহ হবে।

তাঁরা প্রত্যেকেই সমস্যার কথা বলতে গিয়ে বলেন, অর্থ সমস্যাটিই মূল। অর্থের জোগান পর্যাপ্ত হলে শোভাযাত্রার কলেবরও সাজসজ্জার মান আরও বাড়ানো যায়। বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তির অনুদানের ওপরও এর অর্থসংস্থান নির্ভর করে। তাই বাঙালি সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী সকল সামর্থ্যবান মানুষের উচিত এই অনুদানের ব্যাপারে আরও সজাগ ও সক্রিয় হওয়া।

আমার আমির মিছিল : মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে

বাঙালির নববর্ষের এসব আয়োজন আমাদের সংস্কৃতিকে তার যথাযথ পথে স্থিত করে নতুন প্রবহমানতা দিয়েছে। তাই কামনা করতে হয়, এই মিছিল বার্ষিকগতির একেকটি আবর্তনে কেবলই দীর্ঘতর হোক। প্রতিটি নববর্ষের ভোরের আলোয় রোদের রঙে সাজুক। আর এই রোদেলা পবিত্রতা ভাসিয়ে নিয়ে যাক সকল অমঙ্গল, অপচ্ছায়া আর সাম্প্রদায়িক কূপমন্ডূকতাকে। তারুণ্য তার নিজের আমিকে চিনুক। মনে-প্রাণে বাঙালি হোক। জেগে উঠুক ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে’। আর মস্তক তুলুক, ‘অনন্ত আকাশে, উদার আলোকমাঝে উন্মুক্ত বাতাসে’।