বিমূর্ত ছবির কবি

প্রকৃতির অন্তর্গত রূপ, তার অভিব্যক্তিকে সঙ্গীতের লয়ে কবিতার মতো বিমূর্ত রূপে তুলে ধরেন শিল্পী মোহাম্মদ ইউনুস। প্রকৃতিতে অবগাহন করে শিল্পী তাঁর সৌন্দর্য-চেতনাকে বিচিত্রভাবে অনুবাদ করেছেন। শিল্পীর অন্তর্চোখের আলোয় অন্য এক প্রকৃতির বহুরূপী চিত্রণ দেখা গেল গুলশান লেকসংলগ্ন প্রকৃতির নন্দিত আবহে আধুনিক স্থাপত্যের অনন্য ভবনে প্রতিষ্ঠিত এজ গ্যালারিতে।

মোহাম্মদ ইউনুস বাংলাদেশের সমকালীন চারুশিল্পের একজন বিমূর্ত অভিব্যক্তি চিত্রকর। গত শতকের সত্তর দশকের তাঁর শিল্প-অভিযাত্রার সূচনা। ১৯৭৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে চিত্রকলায় স্নাতক এবং ১৯৮৭ সালে তিনি জাপানের তামা চারুকলা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯৯৭ সালে তিনি গবেষণা ফেলোশিপ লাভ করেন। শিল্পী মোহাম্মদ ইউনুস বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগের অধ্যাপক।

দেশে-বিদেশে গত আটত্রিশ বছরে তাঁর একক প্রদর্শনী হয়েছে চল্লিশটি। প্রথম একক ঢাকায় ১৯৭৯ সালে অনুষ্ঠিত হয় ঢাকার গুলশানে সাজু আর্ট গ্যালারিতে। ছয় বছর পর আয়োজিত হলো শিল্পীর একক প্রদর্শনীর। বিমূর্ত সম্পর্ক শিরোনামে আয়োজিত বর্তমান প্রদর্শনী শিল্পীর একচল্লিশতম একক। এতে সাম্প্রতিককালে আঁকা শিল্পীর অর্ধশতাধিক চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হচ্ছে।

x

শিল্পী মনে করেন, শিল্পসৃজন একধরনের গবেষণা। শিল্পীকে প্রতিনিয়তই নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভেতর দিয়ে নিজের সৃজনের স্বকীয় জায়গাটা বের করে নিতে হয়। নিয়মিত ছবি আঁকা সৃজনশিল্পীর কাছে ভ্রমণতুল্য এক অভিজ্ঞান। শিল্পী ইউনুসের কাছে এ ভ্রমণ ঠিক নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাত্রা নয়, বরং যাত্রাপথে নতুন কিছু অনুসন্ধান কিংবা আবিষ্কারের চেষ্টা। এ জন্য শিল্পী ইউনুসের চিত্রপটে অনেকগুলো বর্ণপর্দার আবির্ভাব ঘটে। এককটি বর্ণপর্দার পরতে পরতে যে রং থাকে, তার কোনো কোনো অংশ ক্রমান্বয়ে স্বচ্ছ হয়ে চিত্রের উপরিভাগে উঠে আসে। ফলে নানা বর্ণপর্দার মিথস্ক্রিয়ায় দৃষ্টিনন্দন রূপ পরিগ্রহ করায় অনন্য হয়ে ওঠে তাঁর সৃজন। দেয়ালের গল্প সিরিজের কাজগুলোয় তাঁর এই বিশেষ টেকনিকের প্রয়োগ দেখা যায়। একটি দেয়াল প্রথমে পরিচ্ছন্ন থাকে, পরে সময়ের পরিবর্তনে প্রাকৃতিকভাবে যেমন এটি বদলে যেতে থাকে তেমনি রক্ষণাবেক্ষণের কারণেও এর অবয়ব বদলে যায়। এই বদল প্রক্রিয়াকে নন্দিতভাবে তুলে ধরেছেন শিল্পী।

প্রকৃতিকে বিষয় করে ছবি আঁকেন না এমন শিল্পী বিরল, অন্তত আমাদের দেশে। এখানে একজনের কাজের ধরন ও টেকনিকের সঙ্গে দৃশ্যত অন্যদের কিছু বিষয়ের সাদৃশ্য ঘটা বিচিত্র নয়। শিল্পী মোহাম্মদ ইউনুস এ বিষয়ে সচেতন থেকেই দীর্ঘকাল নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিজের এক চিত্রভাষা ও প্রকরণ নির্মাণ করেছেন।

কালো, ধূসর, ছাই যেন ইউনুসের পছন্দের রং। এসব রং পাওয়া যায় আমাদের মাটিতে, খড়ির চুলায় ও নদীতীরবর্তী বালুচরে। এ রং নিয়ে শিল্পী খেলেছেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। আমরা দেখতে পাই জন্মস্থান দূর মফস্বল শহর ঠাকুরগাঁওয়ের মাটি ও প্রকৃতির রং যেন নতুন করে আবিষ্কৃত হযেছে শিল্পীর চিত্রপটে। ২০১৫ সালে আঁকা ডার্ক ইমেজ নামের চিত্রে ধূসর বর্ণের মায়ময় আবহের দক্ষ ব্যবহার করেছেন শিল্পী। ঠাকুরগাঁওয়ের গ্রামাঞ্চলের মাটির ঘর, কৃষকের খননযন্ত্রের ইমেজ ও টেক্সচার যেন তুলে এনেছেন তাঁর চিত্রপটে।

x

তাঁর কতক ছবিতে আমরা শিশুদের আঁকা ছবির অংকনবৈশিষ্ট্য দেখতে পাই। অসহজ অবসর শিরোনামে তাঁর আঁকা নীলাভ ধূসর আবহে এক নদীবক্ষে পাঁচটি নৌকার ছবি শিশু আঁকিয়ের সরলতায় এঁকেছেন ইউনুস। গ্রীষ্ম নামের সিরিজ চিত্রেও শিশুচিত্রকলার কতক অংকনবৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। এ প্রসঙ্গে শিল্পীর স্বীকারোক্তি- শিশুদের সরল অংকন তাঁকে আকৃষ্ট করে। এ জন্য তিনি সচেতনভাবে শিশুদের আঁকার ধরনকে শিশুর সারল্যেই তাঁর চিত্রপটে তুলে ধরেন।

শিল্পী তাঁর চিত্রকর্ম প্রসঙ্গে নিজেই কবুল করেন- কেউ যদি জিজ্ঞাসা করেন, এটা কী এঁকেছেন, আমি এর মানে বোঝাতে পারব না। তবে অনুভব করার জায়গাটি তাঁকে ধরিয়ে দিতে পারব। আমার কাজ প্রকৃতির অভ্যন্তরের সৌন্দর্যকে প্রকাশ করা। শিল্পীমনের আধ্যাত্মিক অনুভূতির সংমিশ্রণ নিয়ে রং-রেখা-টেক্সচার নিয়ে আমার আঁকা, যা মনের ক্ষুধা নিবারণ করে, ধ্রুপদী সঙ্গীতের মতো শরীর ও মনকে আন্দোলিত করে, হৃদয়কে স্পর্শ করে।

এবারের প্রদর্শনীতে বড় আকারের কয়েকটি ক্যানভাসে শিল্পী অপেক্ষাকৃত উজ্জ্বল রং ও টেক্সচার এঁকেছেন। সেগুলোও ভারী দৃষ্টিনন্দন হয়েছে শিল্পীর দক্ষ হাতের কাজে ও টেকনিক প্রয়োগের মুনশিয়ানায়। এর একটি কাজের শিরোনাম কসমোপলিটন রেড। এটি ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিক রঙে আঁকা। এ ছাড়া প্রদর্শনীর কাজগুলো শিল্পী করেছেন তেলরং ও মিশ্ররঙে। ছাপচিত্রীদের অংকন টেকনিকও প্রয়োগ করেছেন শিল্পী। ফলে বেশ বৈচিত্র্য এসেছে প্রদর্শনীতে।