মোস্তাফিজ কারিগর ও তাঁর শিল্পসাধনা

‘সকলেই কবি নয়’। সকলেই শিল্পী নয়। ‘কেউ কেউ কবি’, কেউ কেউ শিল্পী।
শিল্পী ছবি আঁকেন, কবি কবিতা লিখেন। কে না জানে?! কিন্তু কেন আঁকেন? কবি, কবিতাই বা কেন লিখেন? আমাদের সবার কাছের মানুষ কাজী নজরুল ইসলাম বলতেন-

‘আমি গানের পাখি। আমার হাসিতেও গান, কান্নাতেও গান।’

পাবলো পিকাসো বলে গেছেন-
‘একজন শিল্পী ছবি আঁকেন নিজের অনুভূতি আর স্বপ্ন থেকে নিজেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য।’

কেন আঁকেন, কেন লিখেন এ বিষয়ে আমার নিজের আর কিছু বলার নেই। ওপরের দুই উদ্ধৃতিই বুঝে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

কথা হলো যেটা যার জন্য, তার সেটা করাই শ্রেয়তর। যে যার জন্য, তাকে তার কাছেই যেতে হবে। খুঁজে বের করতে হয় আপনার আপন কে। এই খোঁজাটা নিজেকেই খুঁজতে হয়। জীবনসায়াহ্নে এসেও অনেকেই খুঁজে পায় না, কেন এই জীবন? কেন এলো আবার কেনইবা চলে যাচ্ছে। আসা-যাওয়ার মাঝের এই সময়টা কি আদৌ সার্থক হলো? কোথায় তার আনন্দের উৎস, ডুবে থাকার জায়গা। জীবনটা তাদের কাছে নৈর্ব্যক্তিকই থেকে যায়। এটা না ওটা, ওটা না এটা- এ রকম হা-হুতাশেই শেষ।

মনের মধ্যেও মন থাকে, বিন্দুবাসিনী মন। যে ওই মনের খোঁজ যে পেয়েছে তাঁর কাছে এই জগৎ-সংসার কিছুই না। সে আপন ধ্যানে, আপন কাজেই মগ্ন থাকে।

‘তারে যে দেখেছে, সেই মজেছে
ছাই দিয়ে সংসারে’

এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী জীবন তো একটাই। এ জীবন যেন আনন্দময় হয়, সার্থক হয়। এ আনন্দ মনের আনন্দ।

মোস্তাফিজ কারিগর খুঁজে পেয়েছেন তাঁর আনন্দের জায়গা, সুখের জায়গা, অপার শক্তির জায়গা, আপনার আপন কাজ। রং ছড়ানোতেই কারিগরের আনন্দ, সুখ, সার্থকতা। স্বপ্ন দেখেন, স্বপ্ন আঁকেন, স্বপ্ন লিখেন।

উর্বর ভূমি কুষ্টিয়ার ছেলে কারিগর। লালনের দেশের মানুষ। গ্রাম ও মফস্বল মিলিয়ে বেড়ে ওঠা। গড়াইয়ের অপার স্নেহে লালিত। গড়াই দুহাত ভরে দিয়েছে। কত সুখ, দুঃখ, স্বপ্ন, আনন্দ, বেদনার সাক্ষী শুধু এই গড়াই, আর কেউ না। গড়াই পাড়ে বসেই স্বপ্নদেখার শুরু। ছবি আঁকবে আর লিখবে। হাতেখড়ি ছোটবেলাতেই, শিল্পী শেখ মাসুদের কাছে।

এরপর শুধু বেড়ে ওঠা। ঢাকায় এসে চারুকলা থেকে অনার্স শেষ করেন।

কারিগরের ছবিতেও বহতা গড়াই উঠে এসেছে। গড়াই পাড়ের জীবন-জীবিকা। যা এখনো টিকে আছে, যা হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। কারিগর ধরে রাখছেন তাঁর ক্যানভাসে। গ্রামীণ জীবন ও জীবিকার দৃশ্যপট, মফস্বলের দুরন্ত দুপুরে সাইকেলে চেপে কুষ্টিয়া চষে বেড়ানো দগ্ধ স্মৃতি, গড়াইয়ের পাশে বসে কাটানো পড়ন্ত বিকেল, হলুদ গড়াইয়ে সোনালি স্বপ্নের প্লাবন।

এই ক্যানভাস থেকে কখনো গল্প বের হচ্ছে, কবিতা বের হচ্ছে, এখান থেকেই আবার গল্প কবিতা লিখে ফেলছেন। কবিতাই আবার কখনো ছবি হয়ে যাচ্ছে।

বর্তমান আর অতীত, সমকালীন আর বিলীন, সত্তার চাওয়া বা আকাক্সক্ষা আর সামাজিক প্রতিবন্ধকতা, বাসনা আর চিরায়ত বোধ এসব বৈপরীত্যের মাঝে যে দেয়াল, এই দেয়ালটাই যেন কারিগরের ক্যানভাস।

মেধাসম্পন্ন শিল্পী মনিরুল ইসলাম এবং রফি হকের কাজ দ্বারা প্রভাবিত। এখান থেকেই তাঁর আপন পথচলা সময়ে তা আর সুদৃঢ় হবে, আমি তাই আশা রাখি।

কারিগর সীমানা পেরোতে চান। ছবি যেন কাঁটাতার পেরোতে পারে, দেশের সীমানা পেরিয়ে গিয়ে মুখ থুবড়ে না পড়ে। ছবির সঙ্গে দর্শকের যোগাযোগটা যেন দেশকালভেদে কোনো বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। এ রকমটাই কারিগরের চেষ্টা ও প্রয়াস। কারিগর এ ক্ষেত্রে অনেকটাই সার্থক, আরও এগিয়ে যেতে হবে। সময়ে তা হবে। সৃষ্টি কখনো অপূর্ণ থাকে না আবার পরিপূর্ণও হয় না।

মোস্তাফিজ কারিগরের এ পর্যন্ত ৩টি একক চিত্র প্রদর্শনী হয়েছে। প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনী ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে ২০১২ সালে, দ্বিতীয় একক চিত্র প্রদর্শনী ২০১৫ তে আমেরিকায়।

কবি হুমায়ুন কবিরের কবিতা ও কারিগরের ছবি নিয়ে ভিন্নধর্মী একক চিত্র প্রদর্শনী হয়ে গেল বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের চিত্রশালায় খরভব রহ খরমযঃ (অ পড়সঢ়রষধঃরড়হ ড়ভ ঢ়ড়বঃৎু ধহফ ঢ়ধরহঃরহমং)। এটি মোস্তাফিজ কারিগরের তৃতীয় একক প্রদর্শনী। সাত দিনব্যাপী এ প্রদর্শনী শুরু হয়েছিল ৩১ এ ডিসেম্বর, শেষ হয়েছে ৬ জানুয়ারি।

মোস্তাফিজ কারিগর নিজে একজন কবি। তাঁর রচিত প্রথম কবিতার বই ‘নৌকাখন্ডে দেবীর লাল’। কবিতার প্রতি ভালোবাসা থেকেই ছবি ও কবিতার এ রকম যুগপৎ প্রদর্শনীর আয়োজন। মানুষ কেমন যেন দিন দিন কবিতাবিমুখ। কারিগরের চাওয়া- মানুষ কবিতায় ফিরে আসুক। ছবি দেখতে এসে কবিতাটাও পড়া হবে। কারিগরের আঁকা ৩০টা ছবি ছিল এ প্রদর্শনীতে। এখান থেকে ২৫টা ছবি কবি হুমায়ুন কবিরের কবিতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আঁকা।

অপেক্ষা, বৃক্ষের মৃত্যু নেই, পরিচিত অপরিচিতা, দুপুরের সাইরেন, লীলাবতীর গুণ, সিনাইল ডাইমেনসিয়া, খন্ড চিন্তা প্রভৃতি ছবি দর্শকের নজর কেড়েছে।

কবি হুমায়ুন কবির পেশায় চিকিৎসক। যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসিতে তাঁর বাস। তাঁর কবিতার বই বিবস্ত্র গতর থেকেই এই প্রদর্শনীর জন্য কবিতাগুলো নেওয়া।

ভবিষ্যতে শুধু কবিতার প্রদর্শনীও হতে পারে, কারিগর সে রকমটাই ভাবেন। কারিগরের এ ভাবনা প্রস্ফুটিত হোক।