আচার্য সম্প্রদায় ও বিক্রমপুরের গাজীর পট

পৌরাণিক অভিধানে আচার্য সম্বন্ধে বলা হয়েছে ‘শিষ্যকে উপনীত করে যে ব্রাহ্মণ তাকে সংকল্প ও সরহস্যবেদ পাঠ করান’ আর সাধারণ বাংলা অভিধানে লেখা আছে ‘বেদাধ্যাপক শিক্ষাগুরু; যজ্ঞাদি কার্যের প্রধান সম্পাদক’ যদিও এই ব্যাখ্যাটি অনেকটা পৌরাণিক অভিধানের মতোই, কিন্তু এর পরের যে অংশটুকু আমাদের ভিন্ন ধারণা দিচ্ছে তা হলো ‘এক জাতীয় ব্রাহ্মণ, দৈবজ্ঞ ব্রাহ্মণ, গ্রহবিপ্র’। সুতরাং বাংলা অভিধানে সম্ভবত এই বঙ্গেরই কোন বিশেষ শ্রেণির ব্রাহ্মণকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যারা আচার্য নামেও পরিচিত এবং জ্যোতিষী পেশায় যুক্ত।

বাংলাদেশের আচার্য সম্প্রদায় সম্বন্ধে আরও কিছুটা বিস্তারিতভাবে জানতে পারি ১৮৮৩ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত জেমস ওয়াইজের লেখা ঘড়ঃবং ড়হ ঃযব জধপবং ধহফ ঃৎধফবং ড়ভ ঊধংঃবৎহ ইবহমধষ গ্রন্থে। এতে বলা হয়েছে ‘বঙ্গদেশে একজাতের নি¤œশ্রেণির ব্রাহ্মণকে বলা হয় আচার্য; গণক ও দৈবজ্ঞ নামে এই শ্রেণির ব্রাহ্মণরা পরিচিত। শূদ্ররা তাদের স্বীকার করে ব্রাহ্মণ হিসেবে। শূদ্ররা তাদের সম্বোধন করেন গণকঠাকুর হিসাবে।’ গণকঠাকুরের উৎপত্তি সম্বন্ধে অবশ্য পুরাণে পর্যাপ্ত তথ্য সমৃদ্ধ বর্ণনা পাওয়া যায়। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের ব্রহ্মখ- থেকে জানা যায়, ব্রাহ্মণীর গর্ভে সূর্যপূত্র অশ্বিনীকুমারের ঔরসে এক পুত্রসন্তান জন্ম নেয়। ‘অশ্বিনীকুমার নিজে সেই পুত্রকে চিকিৎসাশাস্ত্র ও নানাবিধ শিল্প এবং মন্ত্র শিক্ষা দিলেন। এই ব্রাহ্মণ বেদোক্ত ধর্ম পরিত্যাগ করে জ্যোতিষশাস্ত্র গণনার দ্বারা সব সময় বেতন গ্রহণ করায় পৃথিবীতে গণক আখ্যা পেলেন।’ ‘গণক’ আখ্যায়িত হওয়া ব্রাহ্মণকে অশ্বিনীকুমার প্রদত্ত যেসব শিক্ষায় শিক্ষিত বলে জানানো হয়েছে, তা বাংলাদেশের গণকঠাকুর বা আচার্যদের মধ্যে পরবর্তীকালেও বজায় ছিল বলে নিশ্চিত হওয়া যায়। কারণ জেমস ওয়াইজ আচার্যদের পেশা সম্বন্ধে লিখেছেন, ‘ঠিকুজি ও পঞ্জিকা প্রণয়ন করা এদের মুখ্য পেশা। দৈববিদ্যার অন্য সব শাস্ত্রের জ্ঞান আছে বলে তারা প্রচার করেন। এ ছাড়া দেবদেবীর প্রতিমার নকশাকারী ও চিত্রকর হিসেবে তারা স্বীকৃত। প্রতিমা গড়েন কুম্ভকার আর আচার্য তা রং দিয়ে পরিশোভিত করেন। চালচিত্রের ওপর সংশ্লিষ্ট বিষয়াদির দৃশ্য আঁকেন, গৃহসজ্জার কাজও করেন আচার্যি। কার্নিশে তারা নকশা করেন। ঘরের দেয়ালে ফুল লতা-পাতা ও জীবজন্তুর ছবি আঁকেন। সে চিকিৎসকও বটে।’ পূর্বে বিক্রমপুরের আচার্যদের পেশাও ছিল ঠিক একই রকম। লোকসংস্কৃতি বিশারদ তোফায়েল আহমেদ ১৯৮৫ সালে নরসিংদীতে একটি গাজীর পটের খোঁজ পেয়ে সেই সূত্রে বিক্রমপুরের (বর্তমান মুন্সিগঞ্জ) কালিন্দী গ্রাম থেকে সুধীর আচার্যকে কীভাবে আবিষ্কার করেছিলেন সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনাকালে লিখেছেন, ‘পট আঁকা ছাড়া রাশি গণনা ও মন্ত্রের সাহায্যে চিকিৎসার জন্য হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের লোক আসে তাঁর কাছে। বয়নশিল্প প্রধান এস্থানে তাঁতের শাড়ির নকশা আঁকা বহুকাল থেকে তাঁদের পারিবারিক পেশা।’ তবে কুষ্ঠি বা ঠিকুজি তৈরি, কাঠের বিগ্রহ চিত্রণ, মাটির প্রতিমা নির্মাণ, শোলা ও ডাক-পাতে প্রতিমার অলংকার (ডাকের সাজ) তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় নকশা এঁকে দেওয়া ইত্যাদি কাজেও যে সুধীর আচার্যের খ্যাতি ছিল, সে বিষয়গুলো তোফায়েল আহমেদসহ এ দেশের অন্যান্য গবেষক উল্লেখ না করায় আমরা বাংলাদেশের আচার্য বা গণক সম্প্রদায়ের শৈল্পিক প্রতিভার দৃষ্টান্ত বলতে কেবল পটচিত্র এবং তাও শুধু গাজীর পটকেই জেনেছি। অথচ আচার্য বা গণকঠাকুরদের এই বহুবিধ শিল্পচর্চায় সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আমরা যদি পূর্ব উল্লিখিত ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের অংশটি পাঠ করি (যেখানে অশ্বিনীকুমার প্রদত্ত শিক্ষায় ‘নানাবিধ শিল্প’ কথাটিও রয়েছে)। তবে নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, আচার্যরা পুরাণে কথিত সেই গণক সম্প্রদায়েরই উত্তরসূরি; কেননা বাংলার অন্য কোনো শিল্পী সম্প্রদায় (স্বর্ণকার, কর্মকার, শঙ্খকার, মালাকার, কুম্ভকার, সূত্রধর প্রমুখ) এত বিচিত্র ধরনের শিল্পকর্ম নির্মাণে সম্পৃক্ত আছে বা ছিল বলে জানা যায় না। তা ছাড়া বিক্রমপুরের আচার্যদের পট চিত্র নির্মাণের যে কৌশল, বিশেষ করে কাগজ সহজলভ্য হয়ে যাওয়ার পরও তা ব্যবহার না করে পটচিত্রের পরিসর হিসেবে কাপড়ের ব্যবহার অব্যাহত রাখা এবং পরিসর ও রংসহ অন্যান্য উপাদান-উপকরণ তৈরির ক্ষেত্রে প্রাচীন ভারতীয় পদ্ধতি মেনে চলা ইত্যাদি বিষয় কিন্তু বহুযুগ ধরেই বাংলার অন্যান্য অঞ্চলের পটচিত্রে অনুপস্থিত। তবে শুধু উপাদান আর কৌশলের দিক থেকেই নয়, অঙ্কন দক্ষতার দিক থেকেও যে পূর্ববঙ্গের আচার্যরাই একসময়ের শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা পেয়েছিলেন, সে বিষয়েও নির্ভরযোগ্য তথ্য বিশিষ্ট কলাতাত্ত্বিক শ্রী অজিতকুমার মুখোপাধ্যায় দিয়েছেন। তিনি ১৩৪১ বঙ্গাব্দের ‘প্রবাসী’ ফাল্গুন সংখ্যায় ‘বঙ্গের পটচিত্র’ শীর্ষক নিবন্ধে লিখেছেন, ‘আচার্যদের চিত্রগুলি অনেক উচ্চস্তরের এবং ইহাদের চিত্রাঙ্কন পদ্ধতিতে অনাবিল সৌন্দর্য রক্ষিত আছে। চাহিদা এবং উৎসাহের অভাবে তাঁহারা বর্তমানে জ্যোতিষ প্রভৃতি শাস্ত্রের আলোচনা করলেও বংশানুক্রমিক চিত্রাঙ্কন পদ্ধতিগুলি এখনও শিক্ষা করিয়া থাকেন এবং নিজেদের অন্য কোনও উপাধি থাকিলেও অমুকচন্দ্র আচার্য বলিয়াই পরিচয় দেন। আচার্যদের পদ্ধতি অনুসরণ করিয়া কালীঘাটের পটুয়ারা প্রাচীনকালে চিত্রাঙ্কন করিতেন এবং তাহারা বর্ণবিন্যাস অপেক্ষা রেখা সমন্বয় চিত্রে অতি চমৎকার মৌলিকতার পরিচয় দিয়েছেন।’ সুতরাং শাস্ত্রে বর্ণিত গণকঠাকুর কেন এবং কীভাবে আচার্য উপাধি অর্জন করেছিলেন সে সম্বন্ধে শ্রী অজিতকুমার মুখোপাধ্যায়ের উল্লিখিত বক্তব্য থেকেও ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।

সব ধরনের চিত্রচর্চার সঙ্গে অতীতকালে আচার্যদের সম্পৃক্ততা ছিল, এমন তথ্য খুব সহজে পাওয়া গেলেও সব আচার্য পটচিত্র নির্মাণ করতেন বলে মনে হয় না। অতীতে পূর্ববাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে আচার্যদের বসবাস এবং কর্মতৎপরতা থাকলেও বিশিষ্ট লোকশিল্প সংগ্রাহকেরা আচার্যদের আঁকা পটচিত্রের খুব সামান্য নমুনাই সংগ্রহ করতে পেরেছেন। জেমস ওয়াইজের বর্ণনাতেও পটচিত্রের প্রসঙ্গ নেই। ‘প্রবাসী’ ১৩৩৯ এর শ্রাবণ সংখ্যায় প্রকাশিত জসীমউদ্দীনের ‘পল্লীশিল্প’ শীর্ষক প্রবন্ধে আচার্যদের নির্মিত নানা ধরনের শিল্পকর্মের উদাহরণ দেওয়া হলেও তাঁদের আঁকা পটচিত্রের কোনো উল্লেখ নেই। তবে প্রায় একই সময়ে প্রকাশিত ‘বিচিত্রা’র একটি সংখ্যায় গুরুসদয় দত্ত ‘বাংলার রসকলা প্রতিভা’ শীর্ষক নিবন্ধে জানিয়েছেন, ‘পূর্ব বঙ্গের আচার্যরা এখনো পূজা ইত্যাদি উপলক্ষে যেসব চালচিত্র এঁকে থাকেন সেগুলিতে পল্লীকলা পদ্ধতির উল্লেখিত গুণগুলি যথেষ্ট পরিমাণে পাওয়া যায়। পূর্বে এরা পূর্ববাংলার অশিক্ষিত মুসলমানদের জন্য ‘গাজীর পট’ নামে এক রকম জড়ানো পটও আঁকতেন। রেখার অবলীলায়িত জোরালো বিন্যাসের ও বিশুদ্ধ রঙের ছন্দোবদ্ধ প্রয়োগের সবিশেষ কৌশল এগুলিতে পাওয়া যায়।’ এখানে লক্ষ করার বিষয় যে ১৩৩৯ বঙ্গাব্দের দিকে আচার্যরা উৎকৃষ্ট মানের চালচিত্র নির্মাণ করলেও পটচিত্র নির্মাণে তাদের আর সম্পৃক্ততা নেই। তা ছাড়া গুরুসদয় দত্ত আচার্যদের আঁকা পটচিত্র হিসেবে কেবল ‘গাজীর পট’-এর কথাই উল্লেখ করেছেন। সম্ভবত এই লেখার সূত্র ধরেই পরবর্তীকালে বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি বিশেষজ্ঞরা তাঁদের রচনায় আচার্যদের পট বলতে শুধু ‘গাজীর পট’-এর আলোচনা-বিশ্লেষণেই সীমিত থেকেছেন। আবার একথাও সত্য হতে পারে যে (পুরোনো সাময়িক পত্রের আরও কিছু লেখা থেকে ধারণা পাওয়া যায়) গত শতকের দ্বিতীয়-তৃতীয় দশকের দিকে আচার্যরা মূলত গাজীর পট নির্মাণের কাজটুকুই অব্যাহত রেখেছিলেন; অন্যান্য উৎকৃষ্ট পটগুলোর বিষয়বস্তু পৌরাণিক হওয়ায় (হিন্দু ধর্মবিষয়ক) এবং পূর্ববাংলায় ক্রমশ গোঁড়া মুসলিমদের প্রভাব বাড়তে থাকায়, উদ্ভূত বৈরী পরিবেশের কারণেই ওই সব পটের উৎপাদন ও প্রদর্শন বন্ধ হয়ে যায়। যদিও ময়মনসিংহ অঞ্চলের আচার্যরা পৌরাণিক বিষয়ভিত্তিক পটচিত্র নির্মাণ আরও কিছুকাল অব্যাহত রেখেছিলেন বলে তথ্য পাওয়া যায়, কিন্তু সেসব পটের যে নমুনা আমরা দেখতে পাই তা কোনো উৎকৃষ্ট শৈলীজাত নয়। ফলে আশুতোষ মিউজিয়ামে রক্ষিত এবং পূর্ববঙ্গ থেকে সংগৃহীত সবচেয়ে প্রসিদ্ধ (সুকুমার সেনের গ্রন্থে মুদ্রিত ও আলোচিত হওয়ার কারণে) গাজীর পটটিকে বিক্রমপুরের সুধীর আচার্যদেরই কোন পূর্বপুরুষের আঁকা পট হিসেবে গণ্য করতে হয় (যদিও সুধীর আচার্যের আঁকা পটের মান খুবই সাধারণ)। গুরুসদয় দত্ত সংগ্রহশালাতেও একই শৈলীর এবং একই উপাদান-উপকরণে তৈরি বেশ কয়েকটি গাজীর পট সংরক্ষিত আছে। এ পটগুলোর প্রাপ্তিস্থান কুমিল্লা হওয়ায় এবং খুব সম্ভব মুসলিম প্রদর্শকদের (বেদে সম্প্রদায়ের) কাছে পাওয়া গেছে বিধায় এগুলোকে আগে কখনোই আচার্যদের আঁকা পটচিত্র হিসেবে গণ্য করা হয়নি। আমাদের মনে রাখতে হবে, আচার্যরা জীবিকার জন্য পটচিত্র আঁকলেও কখনোই পট প্রদর্শনকে জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করেননি, তাই পট প্রদর্শকদের পটনির্মাতা হিসেবে বিবেচনা করার প্রচলিত রীতিতে আচার্যদের আঁকা পটগুলোকে চিহ্নিত করা সম্ভব নয়।

আমরা জানি, বাংলার বেশির ভাগ জড়ানো পটে (পশ্চিম বাংলার মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, বর্ধমান, বাঁকুড়া ও মেদিনীপুর ইত্যাদি অঞ্চলের পটে) শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব কটি চৌখুপির মাপ প্রায় সমান হয় এবং একটির পর একটি এইভাবে ওপর থেকে নিচের দিকে চৌখুপিগুলোর বিন্যাস। প্রতিটি চৌখুপিতে মূল গল্প বা কাহিনির একটিমাত্র ঘটনাভিত্তিক দৃশ্য আঁকা হয়। তবে কাহিনির সূচনাদৃশ্য হিসেবে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রকে প্রথম চৌখুপিতে সবচেয়ে বড় করে এঁকে পরবর্তী চৌখুপিগুলোর দৃশ্য ঘটনাক্রম অনুসারে পরপর বিন্যস্ত করা হয়। পক্ষান্তরে বিক্রমপুরের আচার্যদের আঁকা পটে কাহিনির সূচনা দৃশ্যটিকে উপস্থাপন করা হয় মাঝখানের সবচেয়ে বড় চৌখুপিতে। ওপরের এবং নিচের দুটো অংশকে আবার দৈর্ঘ্যরে দিকে তিনটি এবং প্রস্থের দিকে তিন অথবা চারটি। (কাহিনি অনুযায়ী তারতম্য হয়) সমান ভাগে বিভক্ত করে নেওয়া হয়। এভাবে এক এক অংশে ৯টি অথবা ১২টি ছোট ছোট চৌখুপি তৈরি করে নিয়ে প্রত্যেক চৌখুপিতে একটি ঘটনাকেই চিত্রায়িত করা হয়। এভাবে ওপর নিচ মিলিয়ে ৯ +১ +৯ অথবা ১২+ ১+ ১২টি চৌখুপির মধ্যে সম্পূর্ণ কাহিনিটি চিত্রিত ও বর্ণিত হয়। এই পট প্রদর্শনের ধরনটিও পশ্চিম বাংলার জড়ানো পট থেকে ভিন্ন। পশ্চিম বাংলার জড়ানো পটগুলোর দুপ্রান্ত দুটো কাঠির সঙ্গে লাগানো থাকে, যার সাহায্যে দুদিক থেকেই পটকে নাটাইয়ের মতো গুটিয়ে নেওয়া যায় (এ কারণে জড়ানো পটকে নাটাই পটও বলে)। পটুয়ারা পট প্রদর্শনকালে নিচের হাতের দ-ে জড়িয়ে থাকা পটকে ওপরের হাতের দ-ে পেঁচিয়ে নিতে থাকেন; ফলে দর্শকের সামনে এক একটি দৃশ্য পর্যায়ক্রমে অবমুক্ত হয়ে ওপরের দিকে গুটিয়ে যেতে থাকা অংশে পুনরায় অদৃশ্য হয়। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে ওই সব পটের আকৃতিকে যেমন বিশাল থেকে বিশালতর করা সম্ভব হয়, তেমনি সেই বিশাল দৈর্ঘ্যরে পটটিকে একজন মাত্র পটুয়ার পক্ষেই প্রদর্শন করা খুবই সহজসাধ্য হয়ে ওঠে। পক্ষান্তরে বিক্রমপুরের আচার্যদের জড়ানো পট আয়তনে একটি বড় মাপের গামছার সমান (লম্বায় ৬/৭ ফুট) এবং প্রদর্শনকালে এই পটকে ম্যাপের মতো মেলে নিয়ে বাঁশের খুঁটিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। তারপর সঙ্গীত, বাজনাসহ তা পরিবেশন করেন অন্তত দুজন (দুজনেই বেদে সম্প্রদায়ভুক্ত)। মূল গায়েন একটি লম্বা কাঠির সাহায্যে চৌখুপিগুলোকে নির্দেশ করে করে গান গাইতে থাকেন, অন্যজন দোহার, যিনি ক্রমাগত শরীর দুলিয়ে খঞ্জনি বাজাতে থাকেন এবং মাঝে মাঝে গানের ধুয়া ধরেন। এই পটের খুবই অভিনব এবং চমৎকার দিকটি হচ্ছে, কাহিনি ও গানের বর্ণনা অনুযায়ী দৃশ্যগুলো আঁকা হলেও সেগুলো সারিবদ্ধভাবে বা অনুক্রমিকভাবে সাজানো থাকে না; গানের প্রথম অংশের বর্ণনা মাঝখানে, পরের অংশ একেবারে ওপরে, তারপর হয়তো একেবারে নিচে, আবার ওপরের ডান দিকের কোনো চৌখুপিতে, তারপরই নিচের বামের কোনো চৌখুপিতে। ফলে পট প্রদর্শক এবং বাদক দুজনেরই অঙ্গভঙ্গিতে অনেকটা নৃত্যের ছন্দ ফুটে ওঠে। পট প্রদর্শনের এই বিশেষ ধরনটির কারণেই সম্ভবত মুন্সিগঞ্জ/ বিক্রমপুর অঞ্চলে পট প্রদর্শনকে একসময় ‘পট নাচানো’ বলা হতো।

পটের আয়তনের সঙ্গে গামছার আয়তনের যে সাদৃশ্য, তার মূল কারণটি হচ্ছে, সুধীর আচার্য এবং তাঁর পূর্বপুরুষেরা একসময় পট আঁকার জন্য গামছাও ব্যবহার করতেন। কারণ সে যুুগে গামছাই ছিল সর্বনি¤œ মূল্যে দু-আড়াই গজ মাপের একখ- কাপড় যা দরিদ্র বেদে-গায়েনদের পক্ষে ক্রয় করা বা সংগ্রহ করা সহজ ছিল। তা ছাড়া বড় মাপের থান কাপড়কে কেটে নিতে হয় বলে তার প্রান্তভাগ সেলাই করে নেওয়ার প্রয়োজন হয়, না হলে প্রান্তভাগের সুতো খুলে আসতে থাকে, যা গামছার ক্ষেত্রে ঘটে না। গামছায় আঁকার আরও একটি বিশেষ কারণ হচ্ছে এর জমিনের হালকা বা কম ঠাসা বুনোট। পরিসরকে ছবি আঁকার উপযুক্ত করে নেওয়ার সময় যে বিশেষ প্রলেপটি জমিনে লাগানো হয় তা সুতোর হালকা বুনোটের ফাঁক গলে সহজেই ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। ফলে গামছার সঙ্গে উক্ত প্রলেপ বা আস্তরের বাঁধুনীটি মজবুত হয়, যা মিলে তৈরি থান কাপড়ের ক্ষেত্রে হয় না। জমিনকে মজবুত করে নেওয়ার বিষয়টি বিক্রমপুরের পটচিত্র নির্মাতাদের গুরুত্ব দিতে হতো এ কারণে যে, বেদে- গায়েনরা পট প্রদর্শনকালে দর্শকদের বাড়তি আনন্দ দেওয়ার জন্য হাতের নির্দেশক দ-টি দিয়ে কখনো কখনো পটের ওপর সজোরে আঘাত করতেন (১৯৮৩ বা ১৯৮৪ সালে নরসিংদীর একটি হাটে পট প্রদর্শনকালীন ধারণকৃত একটি ভিডিও চিত্র বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের আর্কাইভে রক্ষিত আছে) আচার্যদের এই পটে বিভিন্ন দৃশ্য সংবলিত চৌখুপিগুলোর আয়োজন-বিন্যাসে যে অভিনবত্ব লক্ষ করি তা আসলে গামছার আয়তনগত সীমাবদ্ধতারই উপস্বত্ব। কেননা এই পটের বড় চৌখুপির মাপকে আদর্শ ধরে যদি সব কটি চৌখুপিকে (২৫টি) সমান মাপে একটানা সারিবদ্ধভাবে উপস্থাপন করতে হতো তবে মোট ৮টি গামছাকে পর পর জুড়ে নেওয়ার প্রয়োজন হতো। সুতরাং ৬/৭ ফুট দৈর্ঘ্যরে একিিট গামছায় কাহিনির প্রধান চরিত্রকে মাঝখানের বড় চৌখুপিগুলো রেখে ওপরের এবং নিচের দুই অংশকে ছোট ছোট বহু অংশে বিভক্ত করে প্রয়োজনীয় বাকি চৌখুপিগুলো তৈরি করে নেওয়ার মাধ্যমেই এই জটিল সমস্যার একটি সহজ ও অভিনব সমাধান খুঁজে বের করা হয়েছে।

যদিও সাম্প্রতিক সময়ে শম্ভু আচার্যের আঁকা পটচিত্রগুলো তাঁর পূর্বপুরুষদের মতো একই উদ্দেশ্যে নির্মিত হয় না, তাঁর ক্রেতারাও এখন আর সেই বেদে-গায়েনের দল নন বরং শহুরে সম্ভ্রান্ত ও ধনিক শ্রেণির মানুষ কিন্তু তবু তিনি বহুল পরিচিত পটগুলোর অঙ্কনশৈলীতে অতিমাত্রায় পরিমার্জন আনবার পরও পটের আয়তন, বিষয়, দৃশ্য বিন্যাস ও চৌখুপির ইত্যাদির ক্ষেত্রে অতীত ঐতিহ্যকেই অনুসরণ করেছেন। অর্থাৎ আয়তন এবং চৌখুপির বিন্যাসে অভিনবত্বের কারণেই যে এই পট বিশেষ স্বাতন্ত্র্য, গুরুত্ব ও মর্যাদা পেয়েছে সে বিষয়ে শম্ভু আচার্য এবং তাঁর আধুনিক ক্রেতা উভয়েই যথেষ্ট অবগত বা সচেতন। অন্যদিকে গত শতকের সাত ও আটের দশকে কিশোরগঞ্জ ময়মনসিংহের বিভিন্ন অঞ্চলের আচার্যদের আঁকা যে পটগুলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংগ্রহে রয়েছে (সোনারগাঁ, লোকশিল্প সংগ্রহশালা, বাংলা একাডেমি) সেগুলোর মধ্যে আচার্যদের আঁকা প্রাচীন পটের গুণ-মান-উপাদান-বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি অনেক কিছুই কিন্তু খুঁজে পাওয়া যায় না। অথচ শম্ভু আচার্য ও তাঁর পূর্বপুরুষদের আঁকা পটগুলোতে সেই সব প্রাচীন বৈশিষ্ট্যের অনেক কিছু এখনো বিদ্যমান। এদের পটে জমিন প্রস্তুতকরণ থেকে শুরু করে উপাদান উপকরণসহ প্রয়োগ-প্রক্রিয়াগুলো যেমন প্রাচীন ভারতীয় চিত্রাঙ্কন পদ্ধতির অনুসারী তেমনি বিষয় বিন্যাস (বিশেষ করে গাজীর পটের ক্ষেত্রে), অর্থাৎ বিভিন্ন ঘটনার দৃশ্য ও চরিত্র নির্বাচন এবং চৌখুপিগুলোর আয়োজন বিন্যাস ইত্যাদি আশুতোষ সংগ্রহশালায় রক্ষিত এবং সুকুমার সেনের ইসলামি বাংলা সাহিত্যে মুদ্রিত তথা সর্বাধিক আলোচিত প্রাচীন গাজীর পটটির প্রায় অনুরূপই বলা চলে। যদিও প্রাচীন পটটিতে রেখার যে লীলায়িত চরিত্র এবং অবয়বগুলোর গঠন, ভঙ্গি, অভিব্যক্তিতে যে স্বাভাবিকতা লক্ষ করা যায়, সুধীর আচার্য ও শম্ভু আচার্যের পটে সেই সব গুণ আর সেভাবে রক্ষিত হয়নি। তা ছাড়া গাজীবিষয়ক একই শৈলীর পটে ছোট চৌখুপিগুলো প্রায় সম্পূর্ণভাবেই নিচের অংশে বিন্যস্ত এবং সেই বিন্যাসের মধ্যে সংখ্যানুপাতিক সাযুজ্য যেমন ছিল না (কোনো সারিতে ৩টি চৌখুপি, কোনো সারিতে ৪টি) তেমনি চৌখুপিগুলো ছিল প্রতিটি ভিন্ন ভিন্ন মাপের। অবশ্য সুধীর আচার্যের কালেও গাজীর পটগুলো ছিল স্বতঃস্ফূর্তভাবে আঁকা, ফলে চৌখুপিগুলো এক মাপের ছিল না। আসলে শম্ভু তাঁর সাইনবোর্ড আঁকার দীর্ঘ অভিজ্ঞতাজাত কলাকৌশলগুলোকে (স্কেলের ব্যবহার তথা গাণিতিক মাপজোখ ও পরিপাটি বর্ণলেপন) সম্পৃক্ত করে তাঁর হাল আমলের পটচিত্রে যে মাত্রাতিরিক্ত পরিমার্জন এনেছেন, তা দৃশ্যত লোকশিল্পের চরিত্রকেই ম্লান করে দেয়। আবার পটের একেবারে নি¤œভাগে আধুনিক আল্পনা ধাঁচের নকশার সংযোজনটিও কেবল শম্ভুর আঁকা পটেই দেখতে পাওয়া যায়, যা সম্পূর্ণভাবেই পটচিত্রের ঐতিহ্য বিচ্যুত। তবে ছোট বড় সব চৌখুপির চওড়া পটি বা বিভাজন রেখার ভেতরে শিকলের যে একটানা নকশা, তা শম্ভু, সুধীর এমনকি প্রাচীন গাজীর পটেও একইভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে, যা বাংলার অন্যান্য অঞ্চলের পটচিত্রের ‘হাশিয়া’ বা পটিতে দেখা যায় না। কিন্তু একমাত্র বিষ্ণুপুরের মল্লরাজ বাড়ির ‘পটের দুর্গা’র পটিতে আমরা যে অতি সরল নকশার প্রয়োগ দেখি তার সঙ্গে শম্ভু আচার্যদের গাজীর পটের নকশার প্রায় হুবহু মিল পাওয়া যায়। মল্লরাজ বাড়ির পটের দুর্গার ছোট চৌখুপিগুলোর আয়োজন বিন্যাস এবং মূল চরিত্র হিসেবে দেবী দুর্গাকে মধ্যবর্তী অংশে বড় আকারে উপস্থাপন করার যে রীতি বিক্রমপুরের গাজীর পটের প্রত্যক্ষ না হলেও পরোক্ষ সম্পর্ক অবশ্যই রয়েছে বলে মনে হয়। এ ধরনের আয়োজনের ধারণাটি যে টেরাকোটা ফলক সমৃদ্ধ মন্দির থেকে এসেছে, সে বিষয়টিও নিশ্চিত হওয়া যায় গাজীর পটে গাজীর এবং পটের দুর্গায়, দুর্গার মাথার ওপরে স্থাপিত খিলানটি দেখে। সাধারণত মন্দিরের অভ্যন্তরে স্থাপিত মূল বিগ্রহটিকে টেরাকোটা সমৃদ্ধ স্তম্ভের সঙ্গে যুক্ত খিলানের ভেতর দিয়ে যেমনটি দেখা যায় ঠিক সেই ধরনের আয়োজনই যেন এই সব পটে অনুসরণ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, বিষ্ণুপুরের ‘পটের দুর্গা’র শিল্পীরা যেমন ভাস্কর-ফৌজদার হিসেবে পরিচিত, অর্থাৎ তাঁরা মূর্তি নির্মাণেও পারদর্শী, ঠিক একইভাবে, বিক্রমপুরের আচার্যরাও যে চিত্রাঙ্কনের পাশাপাশি মূর্তি বা প্রতিমা নির্মাণ করতেন (সুধীর আচার্য করেছেন) সে কথা আগেই বলা হয়েছে। অবশ্য লক্ষ¥ীপূজা উপলক্ষে তৈরি ফরিদপুরও বিক্রমপুরের আচার্যী-সরাতে এবং ময়মনসিংহের আচার্যদের তৈরি মনসাবিষয়ক করান্ডি চিত্রেও আমরা অনেকটা এ ধরনেরই বিভাজনও বিন্যাস দেখতে পাই (ময়মনসিংহের আচার্যরাও চিত্রাঙ্কনের পাশাপাশি প্রতিমা নির্মাণ করেন)।

পশ্চিমবঙ্গের একাধিক সংগ্রহশালায় রক্ষিতে যে বিশেষ ধরনের পটগুলোকে আমরা বিক্রমপুরের বা বিক্রমপুর ঘরানার গাজীর পট হিসেবে গণ্য করছি সেগুলোর মধ্যে পারস্পরিক মিলগুলো যেমন সুস্পষ্ট তেমনি কিছু অমিলও লক্ষ করা যায়। আপাতদৃষ্টিতে এসব পার্থক্যকে নগণ্য মনে হলেও এর উৎসমূলে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস জড়িয়ে আছে বলে ধারণা করি। যেমন সুধীর আচার্য বা তাঁর পুত্র শম্ভু আচার্যের গাজীর পটে আমরা যে বাঘগুলোকে দেখতে পাই তা ডোরাকাটা নয়, ফুটকি বা গোল ছোপ দেওয়া (স্পটেড)। অন্যদিকে এই শৈলীর প্রাচীন পটগুলোর দু-একটিতে আমরা ডোরাকাটা বাঘ যেমন দেখি, তেমনি গোল ছোপ দেওয়া বাঘও দেখতে পাই। সুতরাং বাঘের গায়ের ডোরা বা ফুটকি ধরে আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি কোন পটটি পদ্মা নদীর দক্ষিণের সুন্দরবনসংলগ্ন অঞ্চলের তৈরি আর কোনটি উত্তরাঞ্চলের জন্য। তবে সুধীর এবং শম্ভু উভয়ের আঁকা সব পটেই বাঘের দেহ বুটিদার বা গোল-ছোপ পূর্ণ। লক্ষ্য করার বিষয় যে ইতিমধ্যে সুধীর আচার্য ও শম্ভু আচার্যের সাক্ষাৎকারভিত্তিক যে সব তথ্য-উপাত্ত আমরা পেয়েছি তা থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়, তাঁদের আঁকা পটগুলো সম্পূর্ণভাবেই প্রদর্শিত হতো পদ্মার উত্তরাংশে অবস্থিত সিলেট, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী, বিক্রমপুর ইত্যাদি অঞ্চলে। ফলে ওই সব অঞ্চলে উৎপীড়নকারী বা স্পটেড বা বুটিদার বাঘগুলোই যে বিক্রমপুরের গাজীর পটে চিত্রিত হয়েছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। অন্যদিকে ডোরাকাটা বাঘ সমৃদ্ধ গাজীর পটের যে জনপ্রিয়তা সুন্দরবনসংলগ্ন অঞ্চলে তৈরি হয়েছিল তা সম্ভবত ফরায়েজি আন্দোলনের ফলে সৃষ্ট গোঁড়া মুসলিম চেতনা বিস্তার লাভ করার কারণে লুপ্ত হয়ে যায়। গাজীবিষয়ক এই পটের আরও যে বিশেষ দিকটিতে লক্ষ দেওয়া প্রয়োজন তা হচ্ছে এর শেষাংশে যমপটের খানিকটা অংশ অনেকটা খাপছাড়াভাবেই যুক্ত করে দেওয়া। তাই প্রশ্ন জাগে, যমপটের অংশটুকু গাজীর পটে যুক্ত করা হয়েছে নাকি ইতিহাসখ্যাত প্রাচীন যমপট্টিকরাই মুসলমান প্রধান অঞ্চলে জীবিকার তাড়নায় বা জনচাহিদার কারণে যমপটের মধ্যেই গাজীর কাহিনিকে যুক্ত করে দিয়েছেন এবং ক্রমশ গাজীর কাহিনিকে কোণঠাসা করেছে। অনেকের মতে প্রাচীন যমপট্টিকদের উত্তরসূরিদেরকেই পরবর্তীকালে হিন্দু ও বৌদ্ধরা তাদের পৌরাণিক এবং জাতকের কাহিনি প্রচারে ও মুসলমানরা তাদের ধর্মযুদ্ধ ও পীর আউলিয়ার কাহিনি প্রচারে কাজে লাগিয়েছেন।

সম্ভবত যে জনগোষ্ঠীগুলোর উদ্দেশ্যে এসব কাহিনিভিত্তিক পটচিত্রগুলো রচিত হয়েছিল তাদের মধ্যে তখনো যমপটের কিছুটা জনপ্রিয়তা বিদ্যমান ছিল বিধায় তার রেশ অনেক পটেই রয়ে যায় (৬০ এর দশকে বীরভূমের দুলু পটুয়ার আঁকা এ ধরনের একটি পট লেখকের সংগ্রহে আছে)। কিন্তু আরও যে বিষয়টি বিক্রমপুরের ঐতিহ্যবাহী গাজীর পটে অভিনব তা হচ্ছে গাজীর কাহিনিভিত্তিক দৃশ্যগুলোর ফাঁকে ফাঁকে লক্ষ্মীর পাঁচালিবিষয়ক কতগুলো দৃশ্য এঁকে দেওয়া। মজার ব্যাপার হলো, লক্ষ্মীবিষয়ক যে কথাগুলো গাজীর পট- প্রদর্শকদের গানে উচ্চারিত হয় তার সঙ্গে অতীতে মুসলিম ভিখারিদের গাওয়া লক্ষ্মীর পাঁচালি গানের বেশ কিছু অংশের হুবহু মিল খুঁজে পাওয়া যায়। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী অতীতের সেই সব পাঁচালি গাওয়া মুসলিম ভিখারিরাও বিক্রমপুর এবং ঢোল সমুদ্র অঞ্চলে বাস করতেন।

একই পটচিত্রে একাধিক কাহিনি সংযুক্ত করে নেওয়ার এই বিশেষ ধরনটি বিক্রমপুরের গাজীর পটকে অবশ্যই অভিনবত্ব দিয়েছে এই কারণে যে, বীরভূম, বাঁকুড়া, মেদিনীপুর ইত্যাদি অঞ্চলের দীর্ঘ জড়ানো পটগুলোতে একসঙ্গে দু- তিনটি পৌরাণিক কাহিনি চিত্রিত হলেও তাতে প্রতিটি কাহিনির বিন্যাস পৃথক পৃথক; অর্থাৎ প্রথম কাহিনি শেষ হওয়ার পরই দ্বিতীয় কাহিনি শুরু হয়। ফলে পট প্রদর্শক একটি কাহিনি স্বতন্ত্রভাবে প্রদর্শন ও পরিবেশন করেই পটটিকে গুছিয়ে নিতে পারেন, কিংবা দর্শকদের অনুরোধের পরপর সব কটি কাহিনি উপস্থাপন করতে পারেন। কিন্তু বিক্রমপুরের গাজীর পটে লক্ষ্মীর পাঁচালির অংশটুকু এমনভাবে সম্পৃক্ত যে এই পটের কোনো একটি কাহিনিকে স্বতন্ত্র ও সম্পূর্ণভাবে উপস্থাপন করার সুযোগই নেই। তা ছাড়া লক্ষ্মীর পাঁচালির এমন সব অংশ বেছে নেওয়া হয়েছে যা একসময় এ দেশের কৃষিপ্রধান সমাজে সামাজিক রীতিনীতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল (হিন্দু-মুসলিম উভয় সমাজেই) এবং দৈনন্দিন জীবনে যার ব্যত্যয় ঘটলে যেকোনো মানুষ তার পরিবার ও সমাজের কাছে উপহাসের পাত্রে পরিণত হতো। যে যুগ এ দেশের পল্লী সমাজের সকল ধর্মের মানুষের মধ্যেই যে গাজী, লক্ষ্মী এবং যমের প্রতি একই পরিমাণে শ্রদ্ধা-ভক্তি ও আনুগত্য বজায় ছিল এ পটচিত্রটিতে সেই ইতিহাসও খুবই বিশ্বস্তভাবে রক্ষিত আছে। সুতরাং বিক্রমপুরের কালিন্দী গ্রামের সুধীর আচার্যের পরিবারের মাধ্যমে টিকে থাকা এই বিশেষ রীতির গাজীর পটটিকে কেবল অঙ্কনশৈলীগত অভিনবত্বের কারণেই নয় বিষয়গত কারণেও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।

সংগৃহীত : চারুকলা, ষষ্ঠ সংখ্যা : ১৪২১ (ইং ২০১৫)।