এশিয়ান আর্ট বিয়েনালে বাংলাদেশ

এশিয়ান আর্ট বিয়েনালে ‘আর্ট এন্ড দ্যা সিটি’ শীর্ষক সেমিনারে আমন্ত্রিত বক্তাগণ

গেল বছরের ১ থেকে ৩১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ১৭তম এশিয়ান আর্ট বিয়েনাল। শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮১ সালে। আমার হাত দিয়েই শুরু হয়েছিল এই অনুষ্ঠান। বিয়েনাল অর্থাৎ দ্বিবার্ষিক ভিত্তিতে এই শিল্পকলা প্রদর্শনী আয়োজন ছিল খুবই দুরূহ কাজ। প্রথমত বাংলাদেশ সম্পর্কে, বিশেষ করে এর শিল্প-সংস্কৃতি সম্পর্কে এশীয় অন্য দেশগুলোর কোনো ধারণাই ছিল না। তাই সে দেশে দ্বিবার্ষিক ভিত্তিতে চারুকলা প্রদর্শনী অনুষ্ঠান ছিল কারও কল্পনার বাইরে। ১৯৮০ সালে আমার একবার সুযোগ হলো জাপানে ফুকুওকা আর্ট গ্যালারিতে তাদের এক প্রদর্শনীর বিষয়ে প্রাক-প্রদর্শনী বিষয়ে আলোচনার জন্য এশীয় দেশের শিল্পী, শিল্প-সমালোচকদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। আমি তখন শিল্পকলা একাডেমির চারুকলা বিভাগের পরিচালক। তাই আমাকে পাঠানো হলো ওই আলোচনা অনুষ্ঠানে। যাবার সময় শিল্পকলা একাডেমি থেকে ইতিপূর্বে কয়েকজন বিশিষ্ট চিত্রশিল্পীর ওপর প্রকাশিত চটি বই (সাদা-কালোয় ছাপা) সঙ্গে নিয়ে গেলাম। ফুকুওকা মিউজিয়াম তখন প্রতি চার বছর পর এশীয় দেশের শিল্পীদের একটা করে প্রদর্শনী করত। আমরা বিভিন্ন দেশে থেকে আসা শিল্পীরা একই হোটেলে অবস্থান করছিলাম। দিনের মিটিং শেষ করে রাতে আমরা একত্র হতাম পানাহারের উদ্দেশ্যে। এই সুযোগটা আমি হাতছাড়া করলাম না। আমার কামরায় সব শিল্পীকে আমন্ত্রণ জানালাম। পানাহারের পর্বটা সম্পন্ন করতে। চীন, জাপান, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা ইত্যাদি দেশ থেকে আগত শিল্পীদের নিয়ে যখন জোর আড্ডা চলছে, আমি কোনো কোনো শিল্পীকে ওই চটি বইগুলো দেখার জন্য দিলাম এবং বুঝিয়ে বললাম আমার বিয়েনাল আয়োজনের পরিকল্পনার কথা। অতিথিরা একযোগে সম্মতি জানাল প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের জন্য আমি তখন জানালাম, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া সরকারিভাবে জানিয়ে দিয়েছে প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণে তাদের অপারগতার কথা। তখন ইন্দোনেশিয়ার খুব খ্যাতিমান শিল্পী মোকত্রার আপিন বললেন, ‘সরকারের কথা ভুলে যাও, আমাদের শিল্পীদের একটা সংগঠন আছে। আমরাই তোমাদের প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের জন্য ছবি পাঠাব। একইভাবে ফিলিপাইন ও মালয়েশিয়া জানাল, তারাও পৃথকভাবে ছবি পাঠাবে।

ফুকুওকা মিউজিয়াম আলোচনা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জানতে চেয়েছিল, বাংলাদেশ থেকে আমরা কতজনে কতটা ছবি পাঠাব, কী ধরনের ছবি - এসব বিষয়। আমি ওদের সব প্রশ্নের জবাব সঠিকভাবে দেওয়ায় ওরা খুব খুশি হয়েছিল। কিন্তু আমি তখনো জানতাম না যে আমার এই যাত্রা আমাদের জন্য সোনায় সোহাগা হয়ে দাঁড়াবে। ইন্দোনেশিয়া শুধু ২০টা ছবিই পাঠায়নি; একজন তরুণ শিল্পী প্রতিনিধিও পাঠিয়েছিল। শিল্পী সংস্থার পাঠানো ছবির কথা জানতে পেরে সরকারিভাবেও আরও বিশটা ছবি পাঠানো হয়েছিল। মালয়েশিয়া ১০টা বড় বড় প্রিন্ট পাঠিয়েছিল। আমরা সেগুলো ফ্রেম করে প্রদর্শন করেছিলাম। প্রথম বিয়েনাল প্রদর্শনীতে সম্ভবত ১৫টা দেশ অংশগ্রহণ করেছিল।

প্রতিবন্ধকতা আরও ছিল। তা ছাড়া কারও কোনো সহযোগিতার ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে উল্লেখ করতে হবে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়, যার অধীনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছিল এই প্রদর্শনী। এ ছাড়া সঠিক ধারণা ছিল না কীভাবে প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হবে, তবে সরকারের সর্বস্তরের সহযোগিতা ছিল। বিশেষ উল্লেখ করতে হবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। ওই সময় আন্তর্জাতিক বিভাগের পরিচালক ছিলেন মো. জমির, যিনি বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টা। তিনি দিয়েছিলেন সর্বাত্মক সহযোগিতা। এ ছাড়া আমদানি-রপ্তানি ব্যুরো, তথ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ বিমান, কাস্টমস, নিরাপত্তা বিভাগ প্রভৃতি আরও অনেক সংস্থার নাম উল্লেখ করতে হয়।

প্রদর্শিত শিল্পকর্ম

ঝামেলার কি আর অন্ত ছিল...। একদিন বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ঢাকায় অবস্থিত সব বিদেশি দূতাবাসের প্রধানদের চায়ের আমন্ত্রণ জানানো হয়। তাঁদেরকে প্রদর্শনীর সময় অবহিত করা এবং অনুরোধ করা, তাঁরা যেন তাঁদের সরকারকে বলেন এই প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করতে। তখনো মাসখানেক সময় ছিল প্রদর্শনী শুরু হতে। মাত্র তিনটি দেশ অংশগ্রহণের সম্মতি জানিয়েছিল এবং দুটো দেশ অপারগতা প্রকাশ করেছিল। আমাদের মহাপরিচালক ছিলেন একজন বয়স্ক ভদ্রলোক। তৎকালীন বেতারে চাকরি করতেন। কলকাতায় ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করেছিলেন। আমায় জাহাঙ্গীর সাহেব বলে সম্বোধন করতেন।

কোনো এক বিশেষ কারণে তিনি আমাকে মাঝেমধ্যে ‘ভাই’ বলেও ডাকতেন। তিনি হঠাৎ ওই চা-চক্রে বিদেশিদের বললেন, ‘আমাদের পরিচালকেরই মাথা খারাপ... মাত্র তিনটি দেশ সম্মতি জানিয়েছে প্রদর্শনীর জন্য। এই প্রদর্শনী হওয়া সম্ভব নয়। আমি এবং আমার সহকর্মী সুবীর চৌধুরী ভীষণ হতভম্ব হয়ে গেলাম। লজ্জায়, দুঃখে নিজের কামরায় এসে প্রায় কেঁদেই ফেলেছিলাম। ওই সময় চারুকলা বিভাগে আমার সহযোগী ছিল আরও চারজন শিল্পী - প্রয়াত সুবীর চৌধুরী, খুরশীদ আলম সেলিম (বর্তমানে নিউইয়র্কে ছবি আঁকেন এবং একটা আর্ট গ্যালারি পরিচালনা করেন। আর ছিলেন নাসিম আহমেদ নাফভী (যিনি বিভাগীয় কাজ ছাড়া প্রদর্শনীর ব্রোশিওর মুদ্রণের দায়িত্ব পালন করতেন। আর ছিলেন সায়মন পেরেরা। সবাই ছিল চিত্রশিল্পে গ্র্যাজুয়েশন করা। তাঁদের কথা বিশেষ করে উল্লেখ করলাম এ কারণে যে ১৯৯১ সালে আমি শিল্পকলা একাডেমি থেকে অবসর গ্রহণের পর সুবীর চৌধুরী আরও পাঁচটা প্রদর্শনীর আয়োজন করে অবসর গ্রহণ করেন। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত চারুকলা বিভাগ চারুশিল্পীশূন্য হয়ে পড়ে। কর্তৃপক্ষ ওই বিভাগে চারুশিল্পীদের নিয়োগ দেওয়ার কোনো উদ্যোগই নেননি। অতি সম্প্রতি মনিরুজ্জামান নামের একজন পরিচিত শিল্পীকে চারুকলা বিভাগের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এশিয়ান বিয়েনাল সম্পর্কে একটা সামাগ্রিক ধারণা দেওয়ার জন্যই এই সামান্য পূর্ব ইতিহাসের উল্লেখ।

১৯৯১ সালে আমি শিল্পকলা একাডেমি থেকে অবসর গ্রহণ করি। সে বছরই ৫ম দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী অনুষ্ঠান করি। এশিয়ান আর্ট বিয়েনাল কেবল এশীয় দেশগুলোর শিল্পকর্ম নিয়ে অনুষ্ঠানের কথা এ বিষয়ে জাপানের ফুকুওকা মিউজিয়াম তথা জাপান ফাউন্ডেশন খুবই আগ্রহ প্রকাশ করত এবং সব প্রকার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিত। তাদের কথা হলো, কেবল বাংলাদেশই এশীয় দেশের চারুকলা প্রদর্শনীর আয়োজন হচ্ছে। অন্য কোনো এশীয় দেশ এ কাজটি করছে না। কাজেই এই প্রদর্শনী তোমরা অবশ্যই চালিয়ে যাবে। কেননা, এশীয় দেশের শিল্পীদের কাজকে ইউরোপ বা আমেরিকা পাত্তাই দেয় না। এশিয়ান শিল্পীদের তা সে যত নামকরা শিল্পীই হোক না কেন, কোনো বই ওরা ছাপে না। তাই আমরা ইউরোপ-আমেরিকাকে দেখাতে চাই আমাদের দেশের শিল্পীদের কাজের গুণগত মান মোটেও তাদের কাজ থেকে নিম্নমানের নয়। আমরা নিজেরা আমাদের শিল্পীদের কাজ নিয়ে বই ছাপব। নিয়মিত বিভিন্ন এশীয় দেশে সেমিনার, ওয়ার্কশপ করব। ছোট আকারে ভ্রাম্যমাণ এশীয় শিল্পের প্রদর্শনী করা ইত্যাদি। তাই এই এশিয়ান বিয়েনাল প্রদর্শনী চালু রাখা খুবই প্রয়োজন। আমার সময়কালে এশীয়, দক্ষিণ এশীয় মধ্য এশীয় দেশ থেকে আনা শিল্পীদের দিয়ে প্রদর্শনী হয়েছে।

শিল্পকলা একাডেমি থেকে চলে আসার পর এ নিয়ম ভঙ্গ করে ইউরোপ আফ্রিকা ও আমেরিকায় শিল্পীদের শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হতে লাগে। বহুবার চেষ্টা হয়েছে এশীয় নামটিও বাদ দেওয়ার। কিন্তু ওই সব মিটিংয়ে আমি উপস্থিত থেকে প্রতিবাদ জানিয়ে তা বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছি। এশীয় বিয়েনাল, নাম বদলায়নি কিন্তু এর কলেবরে বদলেছে বহুবার। যেমনটা হয়েছে এবার। আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালি, দক্ষিণ আমেরিকা ইত্যাদি দেশকে যুক্ত করা হয়েছে। এটা হয়েছে আমাদের অবর্তমানে। আসলে বর্তমানে যারা প্রদর্শনী আয়োজনের দায়িত্বে আছেন, তাঁদের এশিয়ান আর্ট বিয়েনালে মূলত উদ্দেশ্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল নন; সে জন্যই এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। এই তো সেদিন একজন স্বনাম শিল্পী আমাকে বললেন, ‘এটাকে এখন বাংলাদেশ বিয়েনাল বললেই হয়।’ আমি জবাবে বললাম, পৃথিবীতে কত বিয়েনালই তো আছে, বাংলাদেশে আরেকটা বিয়েনাল বাড়িয়ে কী লাভ হবে? বাংলাদেশের এশীয় বিয়েনাল যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে, তা এশীয় দেশগুলোর একটা মডেল হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। পিছিয়ে পড়া বহু এশীয় দেশের কাজের কত উন্নতি হয়েছে, তা এবারের প্রদর্শনী দেখলে অনুমান করা সহজ হবে।

এবারের প্রদর্শনী অর্থাৎ ১৭তম প্রদর্শনী। দেখতে দেখতে ৩৫ বছর পার হয়ে গেছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমি দর্শকের সারিতে বসেছিলাম। সামনের সম্পূর্ণ সারিতে আমি এবং সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত চারুকলা বিভাগের পরিচালক খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী মনিরুজ্জামান বসেছিলাম। দেখলাম উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের কার্যাবলি। ভাবছিলাম, এই এশীয় বিয়েনাল প্রদর্শনীর মূল সংগঠককে কেউ চিনলই না বলে মনে হলো। এমনকি চারুকলা বিভাগের পরিচালককে মঞ্চে বসার সৌভাগ্যও হলো না, যা রীতিসম্মত। এমন ব্যবস্থা আসার সময়ে বা তারপরেও কখনো ঘটেনি। চারুকলা বিভাগের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত হয় এই চারুকলা প্রদর্শনী, অথচ সেই পরিচালকের মঞ্চে বসার কোনো সুযোগ হলো না। স্নেহপ্রতিম অনুজ শিল্পী মনিরের অবস্থান দেখে ব্যথিত হয়েছিলাম।

প্রদর্শিত শিল্পকর্ম

যা হোক, বিচারকম-লীর সভাপতি শিল্পী রফিকুন নবী এক এক করে পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পীদের নাম ঘোষণা করলেন। ৯টি পুরস্কারের মধ্যে ৮টিই দেওয়া হলো বাংলাদেশের শিল্পীদের। শুনে এবং দেখে প্রায় হতভম্ব হয়ে গেলাম। বাংলাদেশ হোস্ট কান্ট্রি কী করে সব পুরস্কার নিজেরা নিতে পারল। যত ভালো কাজই হোক না কেন এবং জুরি কমিটির অন্যান্য দেশের সদস্যরা যা-ই বলুক না কেন, আমাদের দেশে অনুষ্ঠিত হওয়া প্রদর্শনীতে সব পুরস্কার আমরা কিছুতেই নিতে পারি না। খুবই অশোভন ঘটনা। বাংলাদেশের একজন বিচারক মানলেও, বিষয়টা নিয়ে একাডেমির মহাপরিচালক চিফ কো-অর্ডিনেটরের সঙ্গে আলোচনা করে অন্তত চারটা পুরস্কার বিদেশি অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের দেওয়া উচিত ছিল। বাংলাদেশের শিল্পীদের কাজ ভালো, এ কথা মাথায় রেখেও পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য ছিল চীনের ‘ডার্ক ইউটোপিয়া’ অথবা ‘হরাইজন্টাল লাইন্স অন দি ফোল্ড’। প্রজাতন্ত্রী কোরিয়ার ইনস্টলেশন সাসপেন্ডেড রিলিজ’। কাতারের ‘ঝঢ়বপহষধ ঋরড়স’ সৌদি আরবের ‘জবষবধংরহম ঐরঃং’ ওমানের ‘১৩ঃয ড়ভ ঃযব ষরভব-১-৩’ এসব ছবি পুরস্কার প্রাপ্তির যোগ্য ছিল বলে আমি মনে করি। আমার মনে হয় পরবর্তী প্রদর্শনীগুলোতে পুরস্কার অর্ধেক/অর্ধেক অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্য অর্ধেক এবং বিদেশের জন্য অর্ধেক নির্ধারণ করে রাখা উচিত। তাহলে বাংলাদেশের প্রদর্শনীর সম্মান বাড়াবে।

প্রথমত এশীয় দেশের বাইরের কোনো দেশের শিল্পকর্মের প্রদর্শনী করাই উচিত নয়। বিদেশ থেকে আমরা অবজারভার আনতে পারি এবং তাদের মাধ্যমে প্রদর্শনী সম্পর্কে কিছু লেখা সংগ্রহ করতে পারি। এ ছাড়া এশিয়ায় এসে এশিয়ার বাইরের দেশগুলোতে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে প্রেস কনফারেন্স (ভিডিও প্রদর্শনীর মাধ্যমে)। দ্বিতীয়ত এবারের প্রদর্শনীতে এশিয়ার যেসব নতুন দেশ অংশগ্রহণ করেছে, তাদের মধ্যে ব্রুনাই, কম্বোডিয়া, কুয়েত, লেবানন, মিয়ানমার, ওমান, তাজিকিস্তান, তুরস্ক, ভিয়েতনামের অংশগ্রহণ সত্যিই প্রশংসনীয়। ফলে বাইরের কোনো দেশের ছবি প্রদর্শনের প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। এবারের প্রদর্শনীতে শিল্পকর্মের গুণগত মান এবং ডিসপ্লে প্রশংসার দাবি রাখে। এবং বড় বড় ব্রোশিওরটিও বেশ আকর্ষণীয়। তবে বাঁধাই দুর্বলতা প্রচ্ছদ নকশা তেমন উচ্চমানের হতে পারেনি। চিত্রকলা প্রদর্শনীর নকশার মেজাজটা যেন নেই - অবশ্য ইতিপূর্বে করা কাইয়ুম চৌধুরীর নকশার সঙ্গে তুলনা করা সঠিক হবে না। যেমনটা ছিল পঞ্চম প্রদর্শনীর প্রচ্ছদ। সমস্ত প্রদর্শনী দেখার পর মনে হলো বাংলাদেশের শিল্পীদের মধ্যে ভিডিও আর্ট এবং ইনস্টলেশনের প্রবণতা অনেক বেড়ে গেছে। এই স্থাপনার কাজ করে গেছেন দ্বিতীয় এশীয় প্রদর্শনীতে জাপানি শিল্পী ‘শিজিত তোয়া’ ৫ম দ্বিবার্ষিকীতে তাকাসামা কুনিয়াসুর অস্তিত্ব ফিরে আসা (ছবি দুটো ছাপতে পারলে ভালো হয় ক্যালিগ্রাফি (ইসলামি পা-ুলিপি) রচনায় কী অপূর্ব পারদর্শিতা দেখিয়েছিলেন কাতারের শিল্পী আলী হাসান আল জাবের ১৯৯১ অনুষ্ঠিত ৫ম দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীতে। প্রথম দিকের প্রদর্শনীর শিল্পকর্মের গুণগত মানের সঙ্গে যদি এখনকার অংশগ্রহণকারী শিল্পকলা বিশেষ করে বিদেশের তুলনা করা হয়, তাহলে বলতেই হবে অনেক নিম্নমানের। এ কথা আরও অনেক শিল্প, শিল্পবোদ্ধাকে বলতে শুনেছি। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমার ঠিক পেছনেই বসে ছিলেন বিচারকম-লীর সদস্য একজন বিদেশি শিল্পী। তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিল অনুভূতির কথা। তিনি খুব নম্রভাবে বললেন, ‘অনেক শিল্পকর্ম বাদ দিতে হতো। বিশেষ করে বিদেশ থেকে আসা শিল্পকর্মগুলো কিউরেট করে বা নিজেরা বাছাই করে আনা উচিত; যা পৃথিবীর বহু দেশ করে থাকে।’ আমার মনে আছে, একই কথা বলে গিয়েছিলেন জাপানি শিল্প-সমালোচক মি. কুরোদয়। কাজটা এত সহজ নয় তবু চেষ্টা করা উচিত ভবিষ্যৎ প্রদর্শনীর মানোন্নয়নের জন্য। এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ তা হলো নামী শিল্পীরা তাদের শিল্পকর্ম যত্রতত্র, বিশেষ করে অপরিচিত প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের জন্য পাঠাতে চান না। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে শিল্পী সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে কিউরেটরদের দিয়ে ছবি করা যেতে পারে।

এবারের প্রদর্শনীতে বেশ ঘটা করে ইনস্টলেশন ও পারফর্মিং আর্টস উপস্থাপনা ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে ভারতের একটা কাজ জবধফরহম ভৎড়স ঃযব মবহফবৎবফ ষধহফ এর মধ্যে নতুনত্বও ছিল, ছিল বাহাদুরিও। বাংলাদেশের শিল্পীদের কাজে যাঁরা পুরস্কৃত হয়েছেন, তাঁদের ছাড়াও আরও অনেক তরুণ শিল্পীর কাজ ছিল প্রশংসার যোগ্য। গ্র্যান্ডপ্রাইজ প্রাপ্ত শিল্পী কামরুজ্জামান স্বাধীনের এৎববফ ইনস্টলেশনটি গুণগত মানে ছিল বেশ উন্নত (ছবি: চিলির যে ইনস্টলেশন কাজটি পুরস্কার লাভ করেছে সেটির যথার্থই পুরস্কারপ্রাপ্তির যোগ্য)। গুণগত মানে এবার কুয়েত ও ওমানের কাজ অনেক উন্নত মানের ছিল। ভিয়েতনামের কাজের মধ্যেও ছিল নৈপুণ্য এবং নতুনত্ব। এবার এশীয় দেশের বাইরে থেকে আমন্ত্রিত শিল্পীদের মধ্যে ছিল ফ্রান্স, পোল্যান্ড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাজ। ফ্রান্সে হিরোকো ইয়ামামোত্রো এবং সি লিন চেন সম্ভবত জাপানি এবং সৈনিক। ভারসা বাপতিস্তে অবশ্য ফরাসি। এদের কাজও ছিল বেশ উন্নত মানের। আমার মনে হয় এশিয়ার বাইরের কোনো দেশের ছবি প্রদর্শনীতে রাখতে চাইলে এভাবে আমন্ত্রিত শিল্পী হিসেবেই তাদের ছবি রাখা যায়।

পরিশেষে বলতে চাই, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক জনাব লিয়াকত আলী লাকী অত্যন্ত নিষ্ঠাবান কর্মী এবং একজন দক্ষ সংগঠক। যদিও কোনো অজ্ঞাত কারণে তিনি একাডেমির চারুকলা বিভাগকে চারুশিল্পীশূন্য করে রেখেছেন। তবে এখন যখন ওই বিভাগের পরিচালক একজন চিত্রশিল্পী নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন, তখন আশা করা যায় বিভাগটি আগের মতো সম্পূর্ণভাবে চারুশিল্পী মাধ্যমে পরিচালিত হবে। এতে করে মহাপরিচালকের গুরুদায়িত্ব অনেকটা সহজ হয়ে আসবে। শুরু থেকে এশিয়ান আর্ট বিয়েনাল উদ্বোধন করতেন রাষ্ট্রপ্রধান। ফলে ঢাকায় সকল বিদেশি দূতাবাসের প্রধানেরা উপস্থিত থাকতেন এই অনুষ্ঠানে। বেশ কয়েক বছর ধরে ব্যতিক্রম দেখছি। দেখছি মাননীয় অর্থমন্ত্রী এই প্রদর্শনীর উদ্বোধন করছেন। অর্থমন্ত্রী আমার বহুদিনের সুহৃদ, বন্ধু এবং একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী কিন্তু রাষ্ট্রপ্রধান থাকলে প্রদর্শনীর গুরুত্ব অনেক বেড়ে যায়। সরকারের সকল মন্ত্রী, উপদেষ্টা এবং বিদেশি দূতাবাসপ্রধানদের উপস্থিতি পুরো অনুষ্ঠানটির মর্যাদা বাড়িয়ে দেয়। দর্শকসারির সামনের চেয়ারগুলোতে একজনও বিদেশি মন্ত্রী বা গণ্যমান্য ব্যক্তির উপস্থিতি না দেখে বেশ হতাশ হয়েছিলাম। বিদেশি দূতাবাসপ্রধানেরা উপস্থিত থাকলে সেই সব দেশে বিয়েনাল প্রদর্শনীয় প্রচার লাভের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। আশা করি বিষয়টি সামনে রেখে ভবিষ্যৎ প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আয়োজনের ব্যবস্থা নেবে শিল্পকলা একাডেমি।