শিল্পপ্রভার চার বছর : ফিরে দেখা

শিল্পভুবনের শিল্পিত প্রকাশনার অঙ্গীকারে, শিল্পের খোলা জানালা হবার অভিপ্রায়ে শিল্পপ্রভার যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১২ সালে। সোসাইটি ফর প্রমোশন অব বাংলাদেশ আর্টের ত্রৈমাসিক মুখপত্র হিসেবে এর আবির্ভাব হলেও, অচিরেই এই প্রকাশনাটি বাংলাদেশের চারুশিল্প ও শিল্পীদের অন্যতম প্রতিনিধি হয়ে উঠেছে। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ২০১৬ তে এসে শিল্পপ্রভার শিল্প অভিযাত্রার চার বছর হলো। এ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে নতুন নতুন মলাটে আকর্ষণীয় ১৫টি সংখ্যা।

মনে হয় এই তো সেদিন ঢাকার ধানমন্ডিতে আর্ট সেন্টারে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হলো শিল্পপ্রভার। সেদিনের উদ্বোধনীতে যাঁরা এসেছিলেন, সময়ের পরিক্রমায় তাঁদের কাউকে কাউকে আমরা হারিয়েছি। সেদিন প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন

সব্যসাচী কবি সৈয়দ শামসুল হক ও বরেণ্য সাংবাদিক সৈয়দ ফাহিম মুনয়েম। এ বছরেই আমরা শিল্পপ্রভার শুভানুধ্যায়ী এই দুজন কীর্তিমানকে হারিয়েছি। তাঁদের স্মৃতির প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা।

শুরু থেকেই আলাদা কিছু করার প্রয়াস আছে শিল্পপ্রভার। শিল্পী ও শিল্পের শিক্ষার্থীর প্রয়োজন মেটাতে উদ্যোগী ভূমিকা নেওয়া, শিল্পাদর্শের ভেতর ও বাইরের ঘটনা তুলে ধরা, দেশ-বিদেশের সমকালীন প্রদর্শনী সমীক্ষা প্রকাশ, বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া, তরুণ লেখক ও শিল্পীদের সঙ্গে মেলবন্ধন গড়ে তোলা- এসব বিষয় নিয়ে শিল্পপ্রভার পাতায় পাতায় যেমন নানা আয়োজন আছে, তেমনি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে নিয়ে কাগজটির আগামী দিনের অবয়ব নির্মাণের প্রচেষ্টাও আছে।

শিল্পপ্রভার সূচনাসংখ্যার প্রচ্ছদে শিল্পী কামরুল হাসানের গোয়াশ মাধ্যমে আঁকা মাছ হাতে এক নারীর

অবয়ব মুদ্রিত হয়েছে। ১৯৭৪ সালে আঁকা কাজটি শিল্পপ্রভার প্রকাশক অঞ্জন চৌধুরীর সংগ্রহে আছে। প্রথম সংখ্যায় চিত্রকলায় প্রতিফলিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে তথ্যসমৃদ্ধ এক আলোচনাসহ মুক্তিযোদ্ধা শিল্পী শাহাবুদ্দিনের সঙ্গে কথোপকথন, কিবরিয়ার বিমূর্ত স্কুল, নানা দেশের দ্বিবার্ষিক প্রদর্শনী, বিদেশে উচ্চশিক্ষার তথ্যসম্পর্কিত লেখা ছাপা হয়েছে।

দ্বিতীয় সংখ্যায় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আঁকা নদী-নৌকার ছবি। ভেতরে জয়নুলের রেখাচিত্র নিয়ে অধ্যাপক আবুল মনসুরের লেখা, চার্লস ড’য়লির আঁকা দু শ বছর আগের ঢাকা, এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী সমীক্ষা, মন্দিরা ভাদুড়ির লেখা মার্কিন চিত্রকর হেনরি ডার্জারের চমকপ্রদ জীবনকাহিনির পাশাপাশি শিল্পী বিজন চৌধুরীর সাক্ষাৎকার সংখ্যাটির উল্লেখযোগ্য রচনা।

তৃতীয় সংখ্যায় এসে মলাট বদলে গেছে। চিত্রকর্মের আলোকচিত্রের পরিবর্তে প্রচ্ছদে ছাপা হয়েছে সবুজ রঙের আবহে সোসাইটি ফর প্রমোশন অব বাংলাদেশ আর্টের উদ্যোগে পাবনায় আয়োজিত আর্টক্যাম্পে অংশগ্রহণকারী শিল্পী ও আয়োজকদের ছবি। এই আয়োজন নিয়ে লিখেছেন শিল্পী ড. রশীদ আমিন। শিল্পী গণেশ পাইনকে নিয়ে স্বয়ং শিল্পপ্রভা সম্পাদক লিখেছেন- ছবির জীবনানন্দ। আর সাক্ষাৎকার দিয়েছেন শিল্পী ও জনপ্রিয় কার্টুনিস্ট অধ্যাপক শিশির ভট্টাচার্য্য।

প্রথম এক বছরে দেখা যাচ্ছে, শিল্পপ্রভায় লিখেছেন নবীন আঁকিয়ে-লিখিয়েসহ স্বনামধন্য শিল্পী ও শিল্পলেখকেরা। নবীন-প্রবীণের মধ্যে সমন্বয়ের চেতনা নিয়ে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেছে শিল্পপ্রভা সম্পাদনা পর্ষদ।

দ্বিতীয় বর্ষশুরু সংখ্যার মলাটে শিল্পী মনিরুল ইসলামের আঁকা ছবি। এতে মিলানের লিওনার্দোকে নিয়ে লিখেছেন আসাদ আলম সিয়াম, ঢাকা প্রিন্টমেকার্সের প্রদর্শনী সম্পর্কে লিখেছেন ড. রশীদ আমিন। আর আছে শিল্পী মনিরুল ইসলামের সাক্ষাৎকার।

দ্বিতীয় বছরের দ্বিতীয় সংখ্যায় শিল্পকর্মের নিলাম প্রসঙ্গে বরেণ্য শিল্পী

সৈয়দ জাহাঙ্গীর, পিকাসো, মাতিস ও অন্যান্য বিশ্বখ্যাত শিল্পীকে নিয়ে লিখেছেন শাহ মুহাম্মদ মুতাসিম বিল্লাহ। মিরো প্রসঙ্গে লিখেছেন মন্দিরা ভাদুড়ি, শিল্পী আনিসুজ্জামানের জলরং প্রদর্শনী নিয়ে আনিসের জলযাত্রা শিরোনামে লিখেছেন বিশিষ্ট শিল্পসমালোচক অধ্যাপক মঈনুদ্দীন খালেদ।

লেখক তালিকায় নবীনের আধিক্য ঘটেছে দ্বিতীয় বছরের তৃতীয় সংখ্যায়। লেখক তালিকায় ছিলেন শিল্পী মাসুক হেলাল, রফি হক, আমজাদ আকাশ, ফরিদা ইয়াসমীন রত্না, জাফরীন গুলশান, শাখাওয়াত টিপু প্রমুখ। মাসুক লিখেছেন অকালপ্রয়াত শিল্পী কাজী হাসান হাবীবকে নিয়ে। শিল্পী রফিকুন নবীর চিত্রকর্ম নিয়ে লিখেছেন জাফরীন গুলশান।

দ্বিতীয় বর্ষের চতুর্থ সংখ্যায় শিল্পী সৈয়দ জাহাঙ্গীর লিখেছেন শিল্পাচার্য জয়নুল: আমার গুরু। এ সংখ্যায় আরও আছে শাহ মুহাম্মদ মুতাসিম বিল্লাহর রচনা দৈবিক গ্যালারিস্ট, ঢাকা আর্ট সামিট নিয়ে ফরিদা ইয়াসমীন রতœার মূল্যায়ন, অঞ্জন আচার্যের রচনায় পয়লা বৈশাখ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা।

তৃতীয় বর্ষের প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে শ্রাবণ ১৪২১-এ। ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মান্যবর জাপানি রাষ্ট্রদূত শিরো সাদোশিমা একজন গুণী চিত্রকর। তাঁর আঁকা ছবি ও বাংলাদেশ নিয়ে তাঁর অনুভূতি সার্থকভাবে উঠে এসেছে শিল্পপ্রভার সম্পাদনা পর্ষদের নেওয়া সাক্ষাৎকার ও লেখায়। কবি, ছবি ও কবিতা নিয়ে প্রাজ্ঞ আলোচনা করেছেন আসাদ আলম সিয়াম। আরও আছে সমকালীন নানা প্রদর্শনী নিয়ে বিভিন্ন লেখকের আলোচনা।

তৃতীয় বর্ষের দ্বিতীয় সংখ্যায় শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে প্রয়াত শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর স্মৃতির প্রতি। তাঁর সালাম দেওয়ার ভঙ্গিমার একটি ছবি এবং নিচে তাঁর স্বাক্ষর নিয়ে করা হয়েছে প্রচ্ছদ নকশা। তাঁর একটি সাক্ষাৎকারও ছাপা হয়েছে এতে। এর শিরোনাম ‘বাংলার লোকশিল্প আমাকে শিল্পী বানিয়েছে’। এ সংখ্যায় লিখেছেন মঈনুদ্দীন খালেদ, জাহিদ মুস্তাফা, ইমতিয়ার শামীম প্রমুখ।

তৃতীয় বর্ষের তৃতীয় সংখ্যার প্রচ্ছদে শিল্পী পল গঁগ্যার আঁকা তাহিতি দ্বীপের দুই তরুণীর ছবি। তাঁর চিত্রকর্মের মূল্যমান ও অন্যান্য প্রসঙ্গে শাহ মুতাসিম বিল্লাহ পর্যালোচনামূলক লেখা লিখেছেন। ভাস্কর নভেরার স্মৃতি নিয়ে লিখেছেন শিল্পী রফি হক। শিল্পাচার্যের ঘর ও ঘরনি নিয়ে লিখেছেন শিমুল সালাউদ্দিন। আমার প্রিয় ছবি নিয়ে সুপাঠ্য একটি রচনা লিখেছেন বরেণ্য শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী।

চতুর্থ বর্ষ প্রথম সংখ্যা চতুর্থ বর্ষপূর্তি সংখ্যা। এ সংখ্যার প্রচ্ছদে ব্যবহৃত হয়েছে শিল্পী মূর্তজা বশীরের আঁকা ছবি ‘পাখা হাতে রমণী’। এ সংখ্যায়

আশীর্বাণী দিয়েছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। শিল্পপ্রভার প্রকাশক অঞ্জন চৌধুরী আগামী দিনের পথচলায় নতুন পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন।

শিল্পপ্রভার চার বছরের প্রকাশনা নিয়ে চার বছরের সালতামামি এ সংখ্যার প্রধান রচনা। এ সংখ্যার আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছে শিল্পসেবী সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের সাক্ষাৎকারভিত্তিক রচনা ‘মানুষের জন্যই সংস্কৃতি’। রফি হক লিখেছেন সালভাদর দালির আত্মজীবনী থেকে। নাসিমুল খবির লিখেছেন ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণীর সৃজনবৃত্তান্ত। দেশ-বিদেশের নানা প্রদর্শনী নিয়ে লিখেছেন শিল্পী মোহাম্মদ ইউনুস, জাহিদ মুস্তাফা, মাহবুবা ইয়াসমিন, মুন রহমান, অপলা সেমন্তী প্রমুখ।

চতুর্থ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যাটি সাজানো হয় খ্যাতিমান শিল্পী শাহাবুদ্দিনকে নিয়ে। প্রচ্ছদে ব্যবহৃত হয়েছে ২০১৫ সালে কলকাতায় গেনজেস আর্ট গ্যালারি আয়োজিত ও ভারতের রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তাঁর একক প্রদর্শনীর উদ্বোধনের মুহূর্ত। সে প্রদর্শনী নিয়ে লিখেছেন ইমদাদুল হক সূফী। শাহাবুদ্দিনের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শিল্পী জাহিদ মুস্তাফা ও মুন রহমান। শিল্পপ্রভার চতুর্থ বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠান নিয়ে শিল্পী রশীদ আমিন লিখেছেন ‘শিল্পের আলোয় শিল্পপ্রভা’। শিল্পের মডেল ব্যবহার ও মডেলদের সুখ-দুঃখ নিয়ে সময়োপযোগী রচনা লিখেছেন মাহবুবা রহমান। মুন রহমান লিখেছেন ঢাকার গুলশান ডিসিসি মার্কেটের দোতলায় নতুন প্রতিষ্ঠিত এসবিপিএ গ্যালারির যাত্রা শুরু নিয়ে। প্রয়াত শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী এবং আসমা কিবরিয়ার স্মৃতিচারণামূলক দুটি লেখা লিখেছেন জাহিদ মুস্তাফা ও ইব্রাহিম ফাত্তাহ। সবচেয়ে দামি ১০ শিল্পকর্ম নিয়ে প্রতিবেদন লিখেছেন শাহ মুতাসিম বিল্লাহ। আশফাকুর রহমান লিখেছেন বেঙ্গল লাউঞ্জে আয়োজিত শিল্পী তৈয়বা বেগম লিপির একক প্রদর্শনী নিয়ে।

চতুর্থ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যার প্রচ্ছদের নিচে প্রচ্ছদ প্রতিবেদনের শিরোনাম ছাপা হয়েছে ‘হে প্রিয় বন্ধু আমার’। ভেতরে অকালপ্রয়াত দুজন বিশিষ্ট মানুষকে নিয়ে স্মৃতিচারণা মুদ্রিত হয়েছে। গুণী সাংবাদিক ও মাছরাঙা টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী সৈয়দ ফাহিম মুনয়েমকে নিয়ে লিখেছেন রফি হক। শিল্পী ও চলচ্চিত্রকার খালিদ মাহমুদ মিঠুকে নিয়ে লিখেছেন তাঁর স্ত্রী শিল্পী কনকচাঁপা চাকমা। তাঁরই আরেক সহপাঠী প্রয়াত ভাস্কর মুকুল মুকসুদ্দীন রানার স্মৃতিচারণা করেছেন শিল্পী মোহাম্মদ ইউনুস। কর্কটরোগে আক্রান্ত হয়ে অকালপ্রয়াত আরেকজন শিল্পী রাজেশ্বরী প্রিয়রঞ্জিনীর স্মৃতিচারণা করেছেন শিল্পী কারু তিতাস। শিল্পী হাশেম খানের জীবন ও সৃজন নিয়ে লিখেছেন মুনতাসীর মামুন। শিল্পী সুমনা হককে নিয়ে লিখেছেন শাহ মুহাম্মদ মুতাসিম বিল্লাহ। শিল্প সংগ্রাহক আনিস এ. খানের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রফি হক। পিকাসোর মডেল লিডিয়া করবেটকে নিয়ে তথ্যনির্ভর প্রতিবেদন লিখেছেন আসাদ আলম সিয়াম।

চতুর্থ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যার মলাটে বর্ষীয়ান শিল্পী মূর্তজা বশীরের ছবি। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছে শিল্পপ্রভা সম্পাদনা পর্ষদ। শিল্পী তাঁর সমগ্র জীবনের নানা পর্যায় ও সৃজন নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। বাংলাদেশে নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূত মেরেতে লুন্ডেমুর আরেকটি সাক্ষাৎকার মুদ্রিত হয়েছে। ঢাকার অদূরে মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের পারিল গ্রাম থেকে বর্ষাকালে নৌকাভ্রমণের মুগ্ধ স্মৃতি নিয়ে লিখেছেন শিল্পী নাসিম আহমেদ নাদভী ‘স্মৃতির দোলায় দে দোল’ শিরোনামে। শিল্পী কাকলীকে নিয়ে লিখেছেন শাহ মুহাম্মদ মুতাসিম বিল্লাহ। নিজের শিল্পী জীবনের অভিজ্ঞতার শিল্পভাষ্য তুলে ধরেছেন রফি হক।

সব মিলিয়ে শিল্পপ্রভার আয়োজন অন্য রকম। শিল্পের জন্য, শিল্পীর জন্য অনন্য। শিল্পী ও শিল্পানুরাগীদের সঙ্গে নিয়ে শিল্পপ্রভা এগিয়ে যাক, এগিয়ে যাক বাংলাদেশের শিল্প আন্দোলন। তবেই না জন্ম সার্থক হবে শিল্পের খোলা জানালার।