ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্ট - আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উৎসব ২০১৬

শিল্পী মমতাজ: আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উৎসব
শিল্পী মমতাজ: আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উৎসব

‘কূল নাই দরিয়ার পারে বৃক্ষ একটি মনোহর এর আগায় বসে সোনার ময়না গেয়ে গেল চল্লিশ বৎসর।। কই গেল সেই তোতা ময়না, কই গেল সেই কোকিলা যার গানে ঘুম ভাঙ্গিয়া হইত মানুষ উতলা! দহিছে সে অন্তর জ্বালা, কাঁপে অঙ্গ থরথর।। তরুণ বয়সে এসেছিল বেহেশতি সুন্দরী হুর দরিয়া মন্থন করিয়া লুটে নিল রত্নপুর।।’

‘আমায় ভাসাইলি রে, আমায় ডুবাইলি রে অকূল দরিয়ার কোন কূল নাই রে।।’
‘বন্ধু রে তোর লাগিয়া ছাড়লাম বাড়িঘর।।’

‘শোনায়ে লোভের বুলি। নেবে না কেউ কাঁধের ঝুলি।। ইতর আতরাফ বলি। দূরে ঠেলে নাহি দেবে।। এমন মানব সমাজ কবে গো সৃজন হবে।। আমির ফকির হয়ে এক ঠাই। সবার পাওনা পাবে সবাই।।’

‘শুয়া চান পাখি আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছ নাকি, তুমি আমি জনম ভরা ছিলাম মাখামাখি, আজি কেন হইলে নীরব মেলো দুটি আঁখি রে পাখি, আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছ নাকি।’

‘চঞ্চল মন, তোমায় দিল কি দয়া হয় না, আমার শোনে না কথা, পাল তুলে দে, বসুন্ধরার বুকে।’

এমন সব গানের সুরে অন্তরে কাঁপন লাগে, মনে মায়া জাগে, হৃদয়ে গভীর

এক অনুভূতির সৃষ্টি হয়। যা সহজ-সাবলীল ভঙ্গিতে মানুষের মনের কথাটুকু জানিয়ে দেয়। তুলে ধরে মানবতাবাদ; প্রকাশ পায় প্রেম, বিরহ, বিচ্ছেদ, মমতা আর ভালোবাসার। এসব ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, জারি, সারি আর বাউল গানই লোকসংগীত। এসব গানের কথা ও সুর স্থান-কাল-পাত্রনির্বিশেষে দেহ-মনে আনে পরম তৃপ্তি। লোকসংগীত গ্রামীণ বা শহুরে- যেকোনো জনগোষ্ঠীর কাছেই সমান জনপ্রিয়।

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক এই লোকসংগীত। দেশের আনাচে-কানাচে হাজার বছর ধরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে এই সংগীত। বাঙালির জীবনদর্শনের প্রতীক এই লোকসংগীত কেবল এ দেশেই নয়, ছড়িয়ে পড়ছে আন্তর্জাতিক পরিম-লেও। সব সুযোগ-সুবিধা দিয়ে যখন কোথাও লোকসংগীতের উৎসব বসে আর এই উৎসব যদি আন্তর্জাতিক হয়, তখন তার তুলনাই হয় না।

স্যাম মিলস্, সুশীলা রামান
স্যাম মিলস্, সুশীলা রামান

গতবারের সাফল্যে এবারের পথচলা
নিজের প্রকৃতি, পরিবেশ আর সমাজের কথা নিয়ে যে লোকসংগীত, তা বুঝতে সংগীতের ব্যাকরণ যে অপ্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে, সেটা বোঝা গিয়েছিল গতবারের আসরে। গত বছরের ১২, ১৩ ও ১৪ নভেম্বর রাজধানীর আর্মি স্টেডিয়ামে সান ইভেন্টস ও মাছরাঙা টেলিভিশন প্রথমবারের মতো আয়োজন করে আন্তর্জাতিক লোকসংগীতের উৎসব ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্ট ২০১৫-এর। এতে দর্শক-শ্রোতার ঢল নামে। কর্মজীবনের ব্যস্ততাকে পেছনে ফেলে সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সংগীতের সুধা আহরণের এমন দৃষ্টান্ত বিশ্বের আর কটি দেশে দেখা যায়!

উৎসবের প্রথম রাতে সংগীত পরিবেশন করেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত শিল্পী ফরিদা পারভীন, চন্দনা মজুমদার, কিরণ চন্দ্র রায়, লাবিক কামাল গৌরব ও শফি মন্ডল; ভারতের পাপন এন্ড ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও অর্ক মুখার্জি কালেক্টিভ এবং পাকিস্তানের বিশিষ্ট শিল্পী সাঁই জহুর।

দ্বিতীয় রাতে দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন বাংলাদেশের বাউল ভজন ক্ষ্যাপা, বারী সিদ্দিকী, আয়েশা জেবীন দীপা, বিউটি খাতুন, দিতি সরকার, মরিয়ম আখতার কণা, মাসুমা সুলতানা সাথী, প্রয়াত সংগীতশিল্পী আব্দুল আলীমের সন্তান আজগর আলীম, জহির আলীম ও নূরজাহান আলীম, মমতাজ, অর্ণব এন্ড ফ্রেন্ডস এবং ভারতের পবন দাস বাউল ও ইউনান আর্ট ট্রুপ।

তৃতীয় ও সমাপনী রাতে সংগীত পরিবেশন করেন বাংলাদেশের গানের দল জলের গানের শিল্পীরা, আয়ারল্যান্ডের শিল্পী নিয়াভ নি কারার, ভারতের জনপ্রিয় শিল্পী পার্বতী বাউল, পাকিস্তানের বিশিষ্ট শিল্পী আবিদা পারভীন ও ভারতের রাজস্থানের সংগীত দল দ্য ম্যাঙ্গানিয়াস ফ্রম হামিরা। রাজস্থানী দলটির ‘সাধের লাউ বানাইলো মোরে বৈরাগী’ গানটির মাধ্যমে সেই রাতে লোকসংগীত উৎসবের পর্দা নামলেও আবিদা পারভীনের গাওয়া ‘দমাদম মাস্ত কালান্দর’ গানটি যেন এখনো কানে বাজছে।

স্বর্গীয় সুরধারায় হৃদয়ে প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে ঢাকায় বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামে ১০, ১১ ও ১২ নভেম্বর সফলভাবে অনুষ্ঠিত হলো ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্ট ২০১৬।

আমাদের বাংলাদেশে এই লোকসংগীতের ভান্ডার এতটাই সমৃদ্ধ যে, বৈচিত্র্যের দিক থেকে গোটা বিশ্বে এটি অতুলনীয় তা আবারও প্রমানিত হলো এবারের আয়োজনের মধ্য দিয়ে।

লোকসংগীতের এবারের উৎসব
আন্তর্জাতিকমানের সংগীতের রস আস্বাদনের সুযোগ এ দেশের তরুণ তরুণীরা তথা সব বয়সের মানুষেই লুফে নিতে কখনই কার্পণ্য করে না। এবার দ্বিতীয়বারের মতো শেকড়ের সন্ধান মিলল তিন দিনব্যাপী শুরু হওয়া লোকসংগীত উৎসবে। হেমন্তের ঠান্ডা পরশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক লোকগানের অমিয় সুধায় বাঙালি নিজেকে ডুবিয়ে নিল অকৃপণভাবে। বিশ্বখ্যাত শিল্পীদের সেই সুর-লয়ের খেলাই পরপর তিন রাতব্যাপী উপভোগ করল বাংলাদেশের সংগীত অনুরাগীরা।

এবারের লোকসংগীতের উৎসবের প্রথম দিনে বাউল সম্রাজ্ঞী মমতাজ গানে গানে মাতিয়ে তোলেন শেষ রাতে। মঞ্চ থেকে ভেসে আসা সুরের জাদু আর আর্মি স্টেডিয়ামের মাঠের সব-দর্শক শ্রোতার মাঝে ছিল উন্মাদনা। মমতাজের আগে সন্ধ্যা থেকেই ধারাবাহিকভাবে গান পরিবেশন করেন বাউল শিল্পী আবদুর রহমান, টুনটুন বাউল, যুক্তরাজ্যের সাইমন থ্যাকার্স সাভারা কান্তি আর সঙ্গে রাজু দাস বাউল ও ফরিদা ইয়াসমিন, পাকিস্তানের জাভেদ বশির।

বাংলাদেশের জনপ্রিয় বংশীবাদক জালালের পরিবেশনার মধ্য দিয়ে উৎসবের দ্বিতীয় দিন শুরু হয়। জালালের মোহময় বাঁশির সুরের ইন্দ্রজালে বুঁদ হয়ে থাকে হাজার হাজার দর্শক। ওই দিন জালালের সঙ্গেই মঞ্চে উঠে কিশোর জাহিদ। জাহিদ গেয়ে শোনায় তার সেই সিগনেচার

গান-‘মধু হই হই বিষ খাওয়াইলা’। এর পর মঞ্চে একে একে আসেন মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানের পালাকার লতিফ সরকার, কানাডার শিল্পী প্রসাদ, বাংলাদেশের তানভীর আলম, ভারতের লোকসঙ্গীতনির্ভর ব্যান্ড দল ইন্ডিয়ান ওশেন, বাউল শফি ম-ল ও লাবিক কামাল গৌরব, স্পেনের কারেন লুগো ও রিকার্ডো মোরো ও শিল্পী কৈলাশ খের।

সমাপনী রাতে সুরে সুরে শ্রোতাদের মোহবিষ্ট করে রাখেন সুনীল কুমার কর্মকার, ইসলাম উদ্দিন কিসসাকার, ভারতীয় শিল্পীদ্বয় নুরান সিস্টার্স, বারী সিদ্দিকী, তাপস অ্যান্ড ফ্রেন্ড এবং পবন দাস বাউল। উপমহাদেশ কিংবদন্তি পবন দাস বাউলের পরিবেশনার মধ্য দিয়েই পর্দা নামে এবারের আসরের।

স্পন্সরঃ
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্ট, আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উৎসব ২০১৬-এর টাইটেল স্পন্সর মেরিল। সহযোগী স্পন্সর: জিপি মিউজিক, ঢাকা ব্যাংক, মাইক্রোসফট বাংলাদেশ ও স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারের মধ্যে খাদ্য- রাঁধুনী, লজিস্টিক- বেঙ্গল ডিজিটাল, ওয়াই-ফাই- আমরা কোম্পানিজ, ব্রডকাস্ট পার্টনার- মাছরাঙা টেলিভিশন, রেডিও পার্টনার- রেডিও দিনরাত, মেডিকেল পার্টনার- স্কয়ার হসপিটালস লিমিটেড, পিআর পার্টনার- মিডিয়া কম, সিকিউরিটি পার্টনার- এজিস সিকিউরিটি ফোর্স, হসপিটালিটি পার্টনার- দ্য ওয়েস্টিন ঢাকা ও রেজিস্ট্রেশন পার্টনার সহজ ডট কম।