বহুমাত্রিক সৈয়দ হকের কিছু চৌম্বক অভিপ্রায়

বাংলাদেশের কবিতায় সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-২০১৬) একটা বলয়ের অধিকারী, নিজস্ব সেই বলয়ে অনুগামী করেছেন প্রজন্মান্তরের কবিদের। উদাহরণে পরানের গহীন ভিতর (১৯৮১)-এর সনেটগুচ্ছ কিংবা একবারে দিব্য-উন্মীলন কাব্যনাট্যের ভাষ্যসমূহ। এসবে বিশ্লেষণমাত্রা হয়ে উঠতে পারে বহুমাত্রিক। কথাটি এ জন্য যে, তাঁর কবিতায় সে ভঙ্গিমাটিই প্রধান। যেন ভরা নদীর মতো উপরিপৃষ্ঠে সৌম্য-শান্ত কিন্তু ভেতরে স্রোতস্বিনীর গতিময়তা। তবে উত্থান-পতন আছে, স্থির বা অস্থিরতা আছে কিন্তু শৈলীটি পেয়েছে দুর্বার দুরন্ত রূপ। কারণটি নির্ণীত হয়, স্বকালবিদ্ধ চেতনা কিংবা পুঁজিবাদী সমাজের চিহ্নিত ব্যক্তির স্বরূপসন্ধানী তৎপরতায়। কবি কাব্যপ্রকরণে বিভাগোত্তর পূর্ব বাংলা, মুক্তিযুদ্ধ এবং তারপরের বাংলাদেশকে চিহ্নিত করেন। এ পর্যায়ে তাঁর নতুন রূপ পলিমাটির প্রান্তজিজ্ঞাসা। প্রত্যন্ত হয়ে ওঠা। তাতে উত্তর-আধুনিক তত্ত্ববীক্ষার প্রান্তস্পর্শী রূপটি উঠে আসতে থাকে। ‘রংগপুর’, কুড়িগ্রাম, নাগেশ্বরীর ওই সব কৈশোর গ্রাম, তার নাগরিক সত্তাটিতে আশ্রয় পায়। নাগরিক হয়েও মধ্যবিত্তের স্মৃতি নস্টালজিয়া কিংবা প্রকৃত আকাঙ্ক্ষা; ভূমিপুত্রের আহ্বান অস্তিত্ব অনুধ্যানে তীক্ষ্ণধী ও মর্মপ্রোথিত। সৈয়দ শামসুল হক পৌঁছান ‘পরানের গহীন ভিতর’-এ।

বাংলা সাহিত্যজগতে এককথায় সৈয়দ শামসুল হকের পরিচয় ‘সব্যসাচী লেখক’ হিসেবে। দীর্ঘ সাহিত্য জীবনে তিনি মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন কবিতা, গল্প, উপন্যাস এবং নাটকসহ শিল্প-সাহিত্যের নানা অঙ্গনে।

এই সব্যসাচী লেখক গত ২৭ সেপ্টেম্বর আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন চিরতরে। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনে এখন শোকের ছায়া। ‘শিল্পপ্রভা’র মোড়ক উন্মোচন করেছিলেন তিনি। তাঁর হাত ধরে ‘শিল্পপ্রভার পথ চলা শুরু। তাঁকে শিল্পপ্রভার পরিবারের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধাঞ্জলি

২.
প্রাথমিক পর্বে এ কবি ‘আমি’ থেকে দ্বিতীয় সত্তা ‘তুমি’তে উন্নীত হলে ‘ভক্তির প্লাবনে’ প্রেমপ্রকৃতি পায় অন্যতর মাত্রা। একাকার রূপটি ক্রমশ বিচিত্র আবেগে জড়ায়- যেখানে থাকে ‘পুরনো প্রাসাদ’, অরণ্যদেশ, ‘নীল-সবুজ-লাল তমসা’ ইত্যাদি রাজ্যের বর্ণিল সংবাদ। তাঁর প্রত্ম-প্রাকরণিক রূপটি তখন অনেকান্ত ছড়ায়। বিষয়ের বৈভবে প্রাগৈতিহাসিক প্রতিচিত্র শুদ্ধ জৈবিকতায় দর্পিত হয় কিন্তু তা কেবল নিরাবলম্ব নয় লোকখেলার গল্পের ভেতর দিয়ে নিজের স্বীকরণে শরীরের সামগ্রিক উষ্ণতাকে করে তোলে বর্ণময়। তখন পুরো বর্ণনাটি পূর্বপুরুষের কামরসে সিক্ত হয়ে নিজেকে করে তোলে পুরাণোক্ত অধীশ্বরের অংশীদার। প্রেম তখনই পূর্ণতর হয়। শুধু বর্তমান নয়, আত্মার উচ্চারণটিতে পেছনের হৃতোচ্ছ্বাস কিন্তু তা পরিব্যাপ্ত বহুদূর। প্রশ্নআর্তি মধ্যবিত্তের, স্বকালের প্রত্যাখ্যানে অতীতে মুখ লুকানো, প্রাচীনে-আদিমে ফেরার মূল্যবোধ, হাহাকারের অনুভব নিজের অবক্ষয়ে-বিনষ্টিতে। ‘নীল-সবুজ-লাল তমসা’ এবং ‘বস্তুত অরণ্য আমি’ থেকে পড়া যায় :

আমি তাকে ভালোবেসেছিলাম আদিম,
অরণচারী, সবুজভূক এক গোত্রের সমৃদ্ধা জননীর মতো,
স্বপ্ন দেখেছি তার অতল অকম্পিত চোখে
আর বিশাল নিতম্বের তরঙ্গে। কিন্তু
স্বপ্ন ভবিষ্যতলগ্না, আর সে আমাকে
চাবুক মেরেছে সার্কাসের মুগ্ধ সিংহকে যেমন করে
দাঁড় করিয়ে টুলের ওপর হাস্যকর ভঙ্গিতে
মহিলার হাতের চাবুকে মারা হয় বিদ্যুতের মতো।

এমন অমর পঙ্ক্তিমালার ভাবানুষঙ্গে কিছু কোলাজ-ধর্মও বেরিয়ে আসে। সেখানে রয়ে যায় কিছু ব্যক্তিগত অনুভূতি কিংবা ‘অন্তঃশীল আবেগে’র আর্তনাদ। যা শব্দসমূহ থেকেই উচ্চারিত। রচিত নির্বাচিত সমাবেশ থেকে বিধৃত শোভনতায় প্রসঙ্গ পরিপ্রেক্ষিত গড়ে। রূপের পরিবেশ এমতে সৃষ্টি ও নিষ্পত্তিতে পৌঁছালে মানবসমষ্টির সন্তুষ্টিতে তা বিন্যস্ত হয়। কবিতা সিরিজে ‘চাঁদ’, ‘পাখি’, ‘স্বপ্ন’, ‘জ্যোৎস্না’, ‘নিদ্রা’ জীবন্ত। মাঝে মাঝে ছলকে ওঠে মরমিয়া আরতি। বাচনের ভিন্নতায় নিহিত দৃষ্টি প্রাত্যহিকতার ভেতরে সমর্পণকেই মানে। সেটিই লোকোত্তর। প্রেমের অপাপবিদ্ধ স্বরূপটি কাব্যে কীভাবে প্রসঙ্গ হয়ে ওঠে, তার উদাহরণ নির্বাণ কিংবা মিলনবিমুখ বিরহকাতরতায়। সৈয়দ হক এর বিপরীত করতে পারেন মানবতার আনন্দকে। যথেষ্ট দীপিত সে উচ্চারণ :

ফেরাও ও দু’টি চোখ, ঘুরে ঘুরে আমাকে দেখো না।
নাস্তির নিপুণ তীরে বিদ্ধ আমি, শোনোনি চিৎকার!-
মধ্যরাতে?

এরূপে ব্যক্তিবিশেষ অনুভব লোকান্তরের বাণী অর্জন করলে অপার অলোকরেখায় তার বিপ্রতীপ অনুধ্যান অন্যটিতে বর্তায়। ‘স্তব্ধ স্বপ্ন প্রণয়ের, চোখ যেন অরণ্যে আঁধার’ কিংবা ‘এ সংসার-পূর্ণিমার ক্ষত,/ বাজায় বিনোদ-কালে নিঃসঙ্গ সেতার’ এমনটা কি দিনগত পাপক্ষয়? বিতর্ক-বিচারের এমন মুখাপেক্ষী থাকা সৌজন্যরহিত কিছু নয়।

স্বকাল তাঁর কবিধর্ম কিন্তু তিনি স্বকালের নন। এ যে অপার শ্রদ্ধার একক আলেখ্য। অপরূপ রূপময়তায় অবিকল উৎকীর্ণ। কবিকে তাই অসংখ্য বার্তায় বা প্রচ্ছদপটে নির্মাণের জন্য আমাদের লোকায়ত জীবন, প্রান্তসংস্কৃতি, মধ্যবিত্তের মাত্রিকতা কিংবা তার সাংস্কৃতিক আনুগত্য, প্রতিরোধী চেতনা আমাদের গড়ে ওঠার পথ বা পুনরুত্থানের শক্তি তৈরি হয় পঙ্ক্তিমালায়। এ কারণে মধ্যবিত্তের সংস্কৃতি ও রুচির বিনির্মাণের পথটি অর্জিত হয় কবিতায়। সমসাময়িক সত্য প্রসঙ্গকে, নির্বিরোধী ভাববলয়কে, প্রগতির আদর্শকে, জাতীয় চেতনার অনুষঙ্গকে, মনন শক্তির অনুপ্রেরণায় প্রোথিত করেন কবি। ‘অনুজার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে’,

‘পহেলা মার্চ ১৯৭১’, ‘একাত্তরের পঁচিশে মার্চের অসমাপ্ত কবিতা’, ‘শামসুর রাহমান, আপনার পঞ্চাশত্তম জন্মদিনে’, ‘স্বাধীনতা’, ‘পঁচিশে মার্চ’, ‘হাসান হাফিজুর রহমানের জন্যে’, ‘কমরেড ফরহাদ/ একটি লোকগাথা’, ‘টিএসসি সড়কদ্বীপে শয়ান আলমগীর কবিরকে’, ‘আমি জন্মগ্রহণ করিনি’, ‘ফিরে এসো রক্তাক্ত বাংলাদেশ’, ‘মুজিবের রক্তাক্ত বাংলায়’- এমন অনেক কবিতা শ্রেয়বোধের জন্ম দেয়; পরিশুদ্ধ চিত্তের দায়কে অবমুক্ত করে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রজ্ঞা ও প্রতিশ্রুতির পরিপ্রেক্ষিত, কালজয়ী ও প্রণিধান ব্যক্তিত্ব কবির কথকতায় প্রতিধ্বনিত। এমন সব সমসাময়িক বিষয়বীক্ষায় কবির কবিতা বিপুলতা পায়। হয়ে ওঠে সর্বজনীন। এ পর্বের কবিতায়ই তিনি বোধ হয় অধিক সার্থক। এবারে পাঠোদ্ধারে আনি ‘শামসুর রাহমান, আপনার পঞ্চাশত্তম জন্মদিনে’ কবিতাটি :

আপনার সমকালে আমি, আর দৃঢ় প্রায় সমভাবে। আপনারই কথা-
কে যেন ডাকল আর- কবিতা? প্রেয়সী? মাটি? বহু নামে একই ভালোবাসা?
বেরিয়ে পড়লাম, গ্রাম থেকে, গলি থেকে, কেউ কেউ ব্রহ্মপুত্রের কোল থেকে,
কেউবা জলাভূমির ওপর গড়ে ওঠা বসতি থেকে, সীমান্তের ওপার থেকে বা-
কে যেন ডাকল আর বেরিয়ে পড়লাম- সে কবেকার কথা-
বিপন্ন জীবনের, বিপন্ন জননীর, বিপন্ন স্বপ্নের, বিপন্ন বর্ণমালার এ সড়কে।

স্বপ্ন আর সান্নিধ্য, আবেগ আর প্রেরণা, বন্ধু-সহকর্মী যোদ্ধার জন্য প্রার্থনা স্পন্দ্যমান কবিতায়। সবকিছু প্রণয়ের সারাৎসার- কিন্তু রোম্যান্টিক প্রতীতি সম্মুখের পারাবার অতিক্রম করে। আশাবাদের স্রোত সেখানে কম নয়। তবে সৈয়দ হকের ওই শৈলীটি, চিরন্তনার সূত্রটি, আত্মার দায়িত্বটি কম নয়। যখন তিনি বলেন ‘ত্বরান্বিত হোক স্বপ্নসমূহের অনুবাদ’, ‘গ্রীষ্মের ফল এবং হেমন্তের শস্যে ভস্ম ও কৃমি’, ‘ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের মধ্যে কোনো রাখাল নেই’ তখন আমরা সম্বন্ধটি স্পর্শ করে ফেলি। এতে করে কবির প্রতি কবির পাশাপাশি যুদ্ধজয়ের লড়াইয়ের দীক্ষাটি মেলে- যেটা একপর্যায়ে হয়ে যায় সকলের।

বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা (১৯৬৯)য় একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আমাদের নজরে আসে। নিরন্তর বয়ানে ছেনে তুলে আনতে দেখা যায় আজীবন অভিজ্ঞতার সবটুকু। থাকে মন্বন্তর, দাঙ্গা, স্বায়ত্তশাসন, স্বাধীনতা। সেখানে পয়ারের বুননিতে নন্দনমাত্রাটি হয়ে ওঠে ব্যতিক্রমী। অনির্বচনীয় যে ইঙ্গিতের অপেক্ষায় আমরা থাকি তা এখানে দুর্বার। এটি বাড়তি মাত্রা। বিচিত্র বিষয়ধন্য কবিতার শুরু ‘বহুদিন থেকে আমি লিখছি না কবিতা’ এরপর বিনয়ের ভেতরেই; অনবরত প্রবহমান স্মৃতিসংলগ্ন প্রত্যেকটি- একেবারে শেষাবধি পৌঁছয়, তারপর কৌশলে ‘শোকগ্রস্ত জননী’র শোকে তা প্রবিষ্ট করান দীর্ঘায়ত পঙ্ক্তিমালায়। পরে বিশ বছর বয়সের বালকের স্বগতোক্তি। শহর-নগর থেকে ক্রমশ প্রান্তে। স্মৃতির ভেতর অবগাহন, জন্মবৃত্তান্ত ও অন্যান্য পরিম-লের আত্মপ্রকাশ। যেন পৌরাণিক তবে- ঠিক প্রাত্যহিক প্রতিটি মানুষের মতোই। গল্পটি জীবনের, আটষট্টি হাজার গ্রামের। মালবাবু, ডাক্তার সাহেব, পল্টু দাদু, পাগলা মেহের অঙ্গীভূত মা-

বাবার স্মৃতি-সত্তায়। কিছু গল্প ক্রমশ বিস্তারিত- আশা-স্বপ্ন বুননে তৈরি করে মননের ঘোর। তাতে করে রাজনৈতিক আঁচড় আর আন্তর্জাতিক বিষয়গুলোর বাইরে মন্ময় রূপটিও অনালোকিত নয় :

আমারও সংসার হবে-
শিল্পের সংসার। চন্দ্রাবতী হবে বোন,
কালিঘাটে আত্মীয় আমার। আমি জানি
মনসার ক্রোধে মানে মানুষের জয়,
চাঁদ রাজা হার মানে। লৌহ বাসরের
কালছিদ্রে চোখ রেখে আমি কালরাতে
পূর্ণিমা ধবল দেহে আজো জেগে আছি।

এরূপ প্রাচ্যপুরাণের সঙ্গে প্রোথিত পাশ্চাত্য প্রতিচিত্র। সেখানে যাবতীয় হয়ে ওঠে চেতনার প্রোজ্জ্বল অংশগুলো। জায়গায় প্রবেশ করে ইতিহাসের আলেখ্য। রচিত কবিতার ভেতরে পরিচর্যা পেতে থাকে রবীন্দ্রনাথ বা পাশ্চাত্যের রূপরীতিকৌশলরীতি। এসব অন্তর্বয়নের ভেতরে কিশোর বালকের গল্প চলতে থাকে, ঘটনার সাক্ষীরূপে। কবিতা হওয়ার গল্পটির সঙ্গে সে অভিজ্ঞতার অন্দরমহল বর্তমান-অতীত, জয়-পরাজয়, স্মৃতি-শ্রুতির মায়াময় খেলার যে অবগুণ্ঠন তা কোলাজধর্মী, ইমেজাশ্রিতও :

ইলিশের গন্ধে আজো ডুবে যায় কত
ঝাঁঝালো বিক্ষোভ, অশ্রু, দুঃখ, পরাজয়।
মানুষেরা বেঁচে থাকে, বংশে বংশে যায়
বাঁচার বরাত দিয়ে কাফনে লোবানে।

উত্তীর্ণ বয়সের বিলাপ উঠে আসে, সেখানে উপস্থিত বান্ধব, তাদের প্রেম, অচরিতার্থতা। শহর হয়ে ওঠে আত্মসর্বস্বের আস্তানা, যৌনবিকৃতি আর কুৎসিত কা-কারখানার স্তূপ। এর মাঝেই আসে সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি ও মুক্তিসংগ্রাম। জীবন বদলায়। জন্মমৃত্যুশোকে তা জরাজীর্ণ। অনবরত চেতনার প্রবাহ তৈরি। ধর্ম-পুরাণ, সংস্কৃতি-ঐতিহ্য প্রাত্যহিক শর্তে কবির আয়ুকে বাড়িয়ে দেয়। কবির চেতনার সে অভিজ্ঞতা বিচিত্র রূপময় :

আবার পুড়তে থাকে মাঝিপাড়া
কুড়িগ্রামে; দাঁড়ায় যুদ্ধের জীপ। ভোরে
পরিমল পালায় ভারতে। দুর্যোধন
কাড়ে সিংহাসন। বেশ্যার যোনিতে খুঁড়ি
সুড়ঙ্গ স্বর্গের।

তবে বৈশাখে রচিত পংক্তিমালার যে ধারাবিবরণী তা পরানের গহীন ভিতরে আরও পুরাণময়। কিংবদন্তির মুগ্ধতায়ও উচ্চকিত। এর বাড়তি

গুরুত্ব সনেটের নিখুঁত নিয়মের নির্মল ভাববিন্যাস। সৈয়দ শামসুল হকের এ পংক্তিমালা অর্থের চেয়ে যেন উচ্চারণমন্ত্রেই বেশি আলোকিত। গ্রামীণ রিচ্যুয়াল, কিংবদন্তি, সংস্কার; প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সরল জীবনবেদ, চরিত্রের সারলতা, ধর্মানুগত্য, ঐতিহ্য-অনুবর্তী ধ্যানধারণা ইত্যাদি অনুরুদ্ধ এই আখ্যানের ভিত্তিমূল। প্রকৃতিনির্ভরতা, বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতি, আচার-আনুষ্ঠানিকতা, বিশ্বাস-শ্রুতি ইত্যাদির দুর্মর বসতি এখানকার নদীবিধৌত বাংলা-অঞ্চলে। নদীই কোনো অঞ্চলে সমস্ত কর্মকা-ের নিয়ন্তা। বাংলার প্রকৃতি-আশ্রয়ী মানুষের প্রেম, বাউলের সুর তাদের জীবনকে গেঁথে দেয়। এর ভেতরেই আসে বাণিজ্য, অনিবার্য পুঁজি-রাজনীতির পৌরোহিত্য। ফলে আচরণের পার্থক্য তৈরি হয়, বদলায় চিরন্তন বিশ্বাস ও মূল্যবোধ। প্রসঙ্গত, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় (১৯৭৬) কিংবা নূরলদীনের সারাজীবন (১৯৮২) কাব্যনাট্যেও এমন অধিষ্ঠান বাড়িয়ে নেন, এগিয়ে যান। পরানের গহীন ভিতর থেকে :

জামার ভিতর থিকা যাদুমন্ত্র বারায় ডাহুক,
চুলের ভিতর থিকা আকবর বাদশার মোহর,
... ... ...
এ বড় দারুণ বাজি, তারে কই বড় বাজিকর
যে তার রুমাল নাড়ে পরানের গহীন ভিতর।

জাদুকরের ভেলকি দেখানো, তার অর্থ আয়; লোকসংস্কৃতির অংশ কিন্তু রুমাল নাড়ার উপলব্ধি একটু ভিন্ন ব্যঞ্জনা। সনেটগুচ্ছে সৈয়দ শামসুল হক ক্যাজুয়াল, বস্তুত নিম্নবিত্তের, প্রান্তিক মানুষই তাঁর বিষয়-আশয়। সে জন্য যে জিজ্ঞাসা, প্রশ্নবিদ্ধ প্রবণতা, প্রাত্যহিক আচার-আনুষ্ঠানিকতা- সবটুকু স্বপ্ন-জাগানিয়া উচ্ছ্বাস- জন্ম-মৃত্যু রহস্য, প্রেম-বৈরাগ্যের প্রতিনিধিত্বকারী। এ শ্রেণিস্তরটি অকিঞ্চন, ব্রাত্য :

নিঝুম জঙ্গলে তুমি শুনছিলা ধনেশের ডাক?
হঠাৎ আছাড় দিয়া পড়ছিল রূপার বাসন?
জলপির গাছে এক কুড়ালের কোপের মতন
তাই কি তোমার দেহে ল্যাখা তিন বাইন তালাক?

এখানে উত্তরটা প্রশ্নই রয়ে যায়। কিন্তু পঙ্ক্তির প্রশ্নেই থাকে উত্তর। মানুষের অনিবার্য অনুষঙ্গ বা সূক্ষ্মতর দিকগুলো যেমন সংস্কারাশ্রিত তেমনি স্বকালবিদ্ধ। সৈয়দ হকের শাশ্বত গ্রামীণ জীবনাভিজ্ঞতায় জমাটবদ্ধ হয় অন্ত্যেবাসীর বৃত্তান্ত। এক প্রকার প্রতিরোধের প্রাকার গড়ে তোলেন, চিনিয়ে দেন প্রতিরুদ্ধ শক্তিকে। যে গ্রাম অবিনাশী, চিরায়ত, সামষ্টিক সে গ্রামের মূল্যবোধগুলো নগরের প্রকোপ বিনষ্ট। অক্লান্ত উত্তাপ গ্রামে পৌঁছায়। প্রকৃতির অবগাহনে অবিকল রূপের নন্দন তৈরিতে সে প্রচ-তার স্মারকটি এখানে মেলে। ‘মানুষ এমন ভাবে বদলায়া যায়, ক্যান যায়? পুন্নিমার চান হয় অমাবস্যা কিভাবে আবার? সাধের পিনিস ক্যান রঙচটা রদ্দুরে শুকায়? সিন্দুরমতির মালা হয় ক্যান বিরান পাথার?’ আমাদের আত্মা-সম্বোধনে একধরনের রতিতে পড়ে। কারণ, ‘সাধের পিনিস’, ‘সিন্দুরমতির মালা’ শুধু ঐতিহ্য নয়; আমাদের জীবনের অংশ। ‘সিন্দুরমতি’ শুধুই একটি স্থান নয়, দ্যুতিময় প্রত্ম-ইমেজ। অনেক কিছুর স্মৃতি, দূরবনগন্ধবহ আমেজ, কৈশোর ও প্রথম যৌবনের তরঙ্গ। সেখানে প্রেমিকার তপ্ত কথা, অচিন বৃক্ষ সংবাদ সবই গৃহীত। গ্রামীণ স্নিগ্ধ প্রকৃতি এখানে প্রধান চরিত্র। আঞ্চলিক ভাষায় অঞ্চল থাকলেও তা ভিত্তিতে সর্বজনীন। কারণ, যমুনা কিংবা করতোয়া; আহাজারির প্রতীক, অচরিতার্থতার প্রতীক হয়ে ওঠে। প্রতিরোধে জঙ্গমী মানুষ বাড়ন্ত, ‘সুখ নিয়া গেলে’, ‘বদল্যায়া গেছে যে বেবাক’ এসব বললে সর্বাঞ্চলিক বার্তাটিই উপস্থাপিত হয়। দ্বিধাহীন উক্তিতে আস্থা-অনাস্থা, পর-আপন, সুখ-অসুখ পেরিয়ে। টোটেম-ট্যাবু ‘গাছ’, ‘সাপ’ ‘নদী’ ভূমি-সংলগ্ন প্রান্তমানুষের ইচ্ছা-বাসনা কিংবা উৎপাদন সম্পর্ক সংলগ্ন বিষয়সমূহ আর্থনীতিক ও সামাজিক গূঢ়তায় চিহ্নিত। কবি এখানে গভীরে প্রোথিত, মূলে প্রবিষ্ট, লোকসংস্কৃতির কেন্দ্রে নিবিষ্ট।

৩.
সৈয়দ শামসুল হক ‘উৎসারিত আলো’র জাগরণ-সম্ভাবনার প্রতীক। ‘সৌন্দর্যময় দীর্ঘশ্বাস’ তাঁর কবিতার জীবন। এ দীর্ঘশ্বাস- তাঁর কবিতার দায়ে; আনন্দময় অস্তিত্বের অনুসন্ধানে। অর্ধশতাব্দীরও অধিক সময়ের কবিতাচর্চায় আর গদ্যে-সনেটে-পয়ারে-প্রবন্ধে-কাব্যনাট্যে-অনুবাদে তিনি এক মোহনীয় জগতের স্থাপত্যকার। সাকল্যে এ তাঁর এক অভিনব প্রণীতজীবন। তাই তিনি নিঃশেষিত নন। নন অক্ষয়ও।