সালভাদর দালির গুপ্তকথা

Printemps Necrophilique
Printemps Necrophilique

প্যারিস শহরে পৌঁছোবার পর আমি টের পেলাম, আমার শত্রুসংখ্যা বহুগুণ বেড়েছে। বিশেষ করে গোয়েমান গ্যালারিতে আমার পেইন্টিংয়ের অসামান্য সাফল্য প্যারিসের আধুনিক শিল্পীরা সহজভাবে নিতে পারেনি। আবার বুনুয়েলের সঙ্গে করা আমার ফিল্ম ‘লাজে দর’ ব্যাঙের ছাতার মতন শত্রু পয়দা করেছে।

কারা ছিল আমার শত্রু। একমাত্র আমার স্ত্রী গালা ছাড়া সবাই, প্রায় সবাই। প্যারিসের সব মডার্ন আর্টিস্ট লাঠিসোঁটা নিয়ে নেমে পড়েছিল।

টাকাকড়ি রোজগারের বিকল্প উপায়ের কথা ভাবতে হলো আমায়। কী কী আমি আবিষ্কার করতে পারি - একটা তালিকা বানালাম :
১. ছোট ছোট আয়না দিয়ে নকল নখ - যাতে একজন নিজের মুখ দেখতে পারে।
২. শোকেসের জন্য স্বচ্ছ নারীপ্রতিমা - যার জলভর্তি দেহের মধ্যে সাঁতার কাটবে গোল্ডফিশ।
৩. ক্রেতার নিতম্বদেশ অনুযায়ী ব্যাক-লাইটের চেয়ার।
৪. সাংবাদিকদের জন্য ক্যামেরা মুখোশ।
৫. নিসর্গদৃশ্যে কান্তি এলে মোটরগাড়ি চালকের জন্য ক্যালাইডোস্কোপিক ও ভুতুড়ে চশমা।
৬. হাঁটাচলার আনন্দের জন্য স্প্রিং লাগানো জুতা।
৭. কেউ বিরক্তি আর ক্রোধ বোধ করলে দেয়ালে ছুড়ে মারার জন্য টুকরো টুকরো জিনিস।
৮. ভেন্টিলেটরের জন্য ঘুরন্ত ভাস্কর্য।
৯. অত্যন্ত গোপন আর মানসিক আনন্দের জিনিস।

Night Specter on the Beach

আমার আবিষ্কারগুলোকে বিশ্বাস করে, আমার স্ত্রী গালা একাগ্রচিত্তে বেরিয়ে পড়ত দুপুরে খাবারের পর। ব্যবসায়ীদের আবিষ্কারগুলোকে দেখাবার জন্য। মুখ চুন করে ফিরে আসত সন্ধ্যাবেলা। আমি দেখতাম গালাকে - ওর আত্মবলিদানে ওকে আরও সুন্দর দেখাত। প্রায়ই আমরা কাঁদতাম বসে বসে। তারপর দুঃখ-কষ্ট প্রশমিত করতে, অবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পাড়ার সিনেমা হলের অন্ধকারে বসে থাকতাম। কিন্তু আমার ভেতরে একটি উপলব্ধি কাজ করত- আজ হোক, কাল হোক আমার আবিষ্কার একদিন বাস্তবায়িত হবেই।

আমার আর গালার মনঃশক্তি এমন ছিল যে আমরা সবকিছু থেকে দূরে থাকতাম। প্যারিস শহরের কোকেন, হেরোইন, চরস, গাঁজা, মদ আফিমের প্রাচুর্য আমাদের ছুঁতে পারত না। আমরা যে কেবল দূরে থাকতাম তা-ই নয়, মপারনাসের শিল্পীমহল, নেশাখোর, সুররিয়ালিস্ট, কমিউনিস্ট, রাজতন্ত্রবাদী, সামাজিক কর্তাব্যক্তি, পাগল, বুর্জোয়া- সকলের থেকে সমদূরত্ব বজায় রাখতাম। আমরা ছিলাম ঠিক মাঝখানে, যাতে নিজেদের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে পারি, ভারসাম্য ঠিক রাখতে পারি। যেভাবে অর্ধবৃত্তাকার অর্গানের মাঝে বসে থাকে বাদক- সেভাবে থেকে আমরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতাম।