আনীশ কাপুর: শিল্প ও প্রযুক্তির উদ্‌যাপন

আনীশ কাপুর: দ্য স্কাই মিরর / ২০০৬

‘একক বস্তু, একক ফর্ম এবং একক রঙ। আমার উদ্দেশ্য হলো স্পেসের অভ্যন্তরে স্পেস তৈরি করা। যাতে উচ্চতা আর উৎসারিত আলোয় স্পন্দিত হবে গঁ-প্যালের বিশালচত্বর। দর্শকেরা আমন্ত্রিত কাজের ভেতর হাঁটার এবং রঙের ভুবনে অবগাহন করার, আমি আশা করি তা হবে ধ্যানাুখী এবং কাব্যিক অভিজ্ঞতা।’

প্যারিসের গঁ-প্যালেতে প্রদর্শিত (১১ মে-২৩ জুন ২০১১) কাজ সম্পর্কে এ হলো ভাস্কর আনীশ কাপুরের ভাবনা। প্যারিসে প্রথম প্রদর্শনীর তিরিশ বছর পর তিনি ফিরে এসেছিলেন ‘মনুম্যান্তা (Monumenta) ২০১১’ প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে। অভিনব নির্মাণশৈলীতে সমসাময়িকদের মাঝে তিনি হয়ে উঠেছেন অন্যতম। কাজের বিশালতা, শৈলীগত আভিজাত্য, আপাতসরলতা হলো তাঁর কাজের সূত্র।

গঁ-প্যালেতে ২০০৭ সাল থেকে প্রতিবছর মনুম্যান্তা শিরোনামে একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পীকে আমন্ত্রণ জানানো হয় প্রদর্শনীতে, আর গ্যালারির বিশাল স্পেসের জন্য তৈরি করতে একটি মাত্র শিল্প স্থাপনা। এই বিস্তৃত স্থানটিকে কেন্দ্র করেই আবতিত হয় তাঁদের ভাবনার বলয়। ১৩ হাজার ৫০০ মিটার স্কয়ার আয়তন এবং ৩৫ মিটার উচ্চতার পরিপ্রেক্ষিতে এক অনুপম অদ্বিতীয় মাত্রার শৈল্পিক মিথস্ক্রিয়া হলো মনুম্যান্তা।

প্রথম তিনটি মনুম্যান্তা প্রদর্শনীর সফলতা ছিল ব্যাপক। পাঁচ সপ্তাহে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার দর্শকের আগমন ঘটেছিল। ২০০৭ সালে উদ্বোধনী প্রদর্শনীটি ছিল জামান শিল্পী অঁস্যালম কিয়েফর, তিনি ফ্রান্সেই থাকেন, পরের বছর ২০০৮ সালে ছিলেন আমেরিকান শিল্পী রিচার্ড সেরা (Richard Serra) এবং ফরাসি শিল্পী ক্রিস্তিয় বলতনস্কি (Christian Boltanski) ২০১০ সালে। ২০১১ তে আনীশ কাপুর।

আনীশ কাপুরের জন্ম বোম্বেতে, ১৯৫৪ সালে। ভারতীয় বাবা এবং ইরাকি ইহুদি মা। নানা ছিলেন পুনার সিনাগগের ক্যান্টব। আর সেই সূত্রে আনীশের মা বেড়ে উঠেছেন ভারতে। জন্মলগ্ন থেকে রক্তে ছিল দুই সংস্কৃতিধারার অসামান্য সংশ্লেষ। বড় হয়েছেন মিশ্র সংস্কৃতির উদ্দীপ্ত পরিবেশে। পরিবারের তিন সন্তানের মধ্যে আনীশ বড়। বাবা কাজ করতেন ভারতীয় নৌবাহিনীতে। ভারতে কলেজ শেষ করে আনীশ ইসরায়েলে যান ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে। ছয় মাস পর মনে হয়েছিল, এ জগৎ তার নয়। প্রযুক্তিবিদ বাবার প্রভাব অনিবার্য ছিল পুত্রের স্বভাবে। নিজ হাতে গড়া স্পন্দমান শিল্প কাজে আনন্দ পেতেন আনীশ। দেড় বছর কিবুজে কাটিয়ে শিল্পী হবেন- এই স্বপ্ন ও সত্যকে গৌরব মনে করে ফিরে আসেন লন্ডনে। ভর্তি হন হর্নসে কলেজ অব আর্টে। পোস্ট গ্র্যাজুয়েট করেছিলেন চেলসিয়া কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ডিজাইনে। হর্নসে কলেজের ডিগ্রি পাবার পর মনে হয়েছিল, তিনি সত্যিকার অর্থেই কিছুতে আগ্রহী। শিল্পের পরশ পাথরের স্পর্শে তাঁর পুরো ব্যক্তিত্বই বদলে গেল।

আনীশ কাপুর: শুটিং ইনটু দ্য কর্নার / ২০০৯

সত্তর দশকের শেষে শুরু হয় শিল্পী জীবনের। আনীশের পছন্দ অবিমিশ্র রং। রং তাঁর চেতনা প্রকাশের প্রিয় মাধ্যম এবং তাকে ব্যবহার করেন একই সঙ্গে অর্থ প্রকাশে এবং সমাপ্তিতে। রং, চামড়া এবং স্পেস- নিজেকে বিস্তারের, বিকাশের আনন্দ হলো এই তিন অনুষঙ্গ। তিনি বিষয়ের দিক থেকে নাগরিক, সমকালীন এবং সেই সঙ্গে পুরাণ, ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক বক্তব্য দিয়ে তাতে নিজের দর্শনের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেন।

মিলেনিয়ামে এসে আমাদের ভাবনার দিকবলয় ক্রমশ প্রসারিত। শিল্পের কতখানি দায় সময়কে অনুসরণ করার, কতটা বাহুল্য ঝরালে ইমেজ সারমর্মে পৌঁছবে, সেই সূত্র আনীশ জানেন। দৃষ্টির সঙ্গে ফেলে আসা দিনের কাহন জানা থাকলে শিল্পীকে বুঝতে সুবিধা হয়। বাবা-মায়ের প্রযতেœ সংস্কৃতির সেতুটা দৃঢ় হলেও তারা দুজনেই কিন্তু সংস্কৃতির পুরবাসী ছিলেন না। আনীশ পড়াশোনা করেছেন ইংরেজি স্কুলে। তার পাবলিক স্কুলের নিয়মনিষ্ঠা কর্তৃত্ব ভালো লাগত না। তবে পড়াশোনায় প্রচন্ড অনীহা সত্ত্বেও কখনো অকৃতকার্য হননি। উতরে গেছেন। ছবি আঁকার মহড়া শুরু হয়েছিল কিশোর বয়সেই। ভারতে থাকতে ছবি আঁকতেন, বিমূর্ত ছবি। জ্যাকসন পোলকের প্রথম দিকের কাজের মতো। সে পর্বের কাজে এখনো তিনি মোহিত। রথকো ছিলেন ভালো লাগার তালিকায়। পোলক প্রবলভাবে অভাবিত ছিলেন পিকাসোর প্রথম পর্বের কাজে। লন্ডনে ছাত্রাবস্থায় ভালো লাগত যোসেফ বয়েস, কান আন্দ্রে, ডোনান্ড জুড- এ নামগুলো তখন শিল্পকলার মাঝে ছিল ফ্যাশন। পোস্ট মডার্ন বয়স কোনো বাঁধাধরা শৈলীতে আটকে থাকেননি, এ ব্যাপারটা কঠোর আনীশের ক্ষেত্রে। ব্রিটেনে বিদেশি অন্যান্য শিল্পীর মধ্যে পল নিয়াগু পলথেকের কাজে খুঁজে পেয়েছিলেন প্রেরণার প্রাণনিকেতন। নিয়াগু তাঁর দেখার চোখ খুলে দিয়েছিলেন। শিল্পসৃষ্টি কমবেশি সৌন্দর্যপূর্ণ জিনিস নয়, বরং তা আরও প্রগাঢ় কিছুর জন্য। এমন কিছু যা জীবনের সঙ্গে লগ্ন, মানবিক- আরও গভীর, যথার্থ শব্দ আধ্যাত্মিক। ভেতর থেকে অবেগটা তাকে তাড়া করেছে। ’৭৭ সালে কাজ করেছেন পল নিয়াগুর সঙ্গে। দুলো ছিলেন তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ লাজগ্রাস, এতো দোনে (Étant donnés)। দি লাজ গ্রাসের বিষয় ছিল বর এবং বধূর নিখুঁত বৈপরীত্য দুলোর রনোর পরিশীলিত বিষয়, প্রয়োগ ভঙ্গিমা থেকে তিনি চিন্তনের কাক্সিক্ষত রূপটি পেয়েছিলেন।

আনীশ কাপুর: লেভিয়াথান / ২০১১

কলেজের দিনগুলোতে আনীশের ভাষায় তিনি ছিলেন মেজাজী, উগ্র। পড়াশোনা শেষে দেশে ফেরার সামর্থ্য ছিল না। জীবনের এ পর্যায়ে তাঁর অস্থির চেতনে চিন্তা, প্রেরণা ও প্রবণতা এক বিস্তৃত বিচিত্র বোধে জারিত হয়েছে। আত্মপরিচয়ে ভারতীয় মানস অনেক বেশি সুস্থিত। উৎস প্রবাহ থেকে চ্যুত হননি। তারপরও নিজের অস্তিত্ব নিয়ে একধরনের কৌতূহল, দ্বিধা ছিল। ভাবতেন, তিনি কী ধরনের মানুষ, ইংরেজ? অবশ্যই না। নিজের ভারতীয় সত্তা অনুভব করতেন, কিন্তু কীভাবে বুঝতেন না। এই না বোঝার অস্বস্তিটা দীর্ঘ সময় তাঁকে আঁকড়ে ছিল, অস্থিরতা ছিল পড়াশোনা শেষের পরবর্তী বছরগুলোতে। অনিশ্চয়তার এ সময়টাতে নিবিড় উপলব্ধি ছিল খুঁজে পাবার এমন কিছু, যা তাঁর সত্যিকার অর্থে একান্ত নিজস্ব। কোন বিষয়টি তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ- এই অমীমাংসিত ব্যাপারগুলো তাড়া করেছে। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাঁচ বছর পরও মনে হয়েছে, তিনি কিছুই শেখেননি।

সংশয় সঙ্কট, দ্বিধায় চঞ্চল স্নায়ু, মনে অস্থিরতা নিয়ে ফিরে যান স্বদেশে, ১৯৭৯ তে। এই ফিরে যাওয়াটা ছিল মূলত আনীশের সৃষ্টির নিজস্ব গতিপথ চিনে নেওয়া। তটরেখার সন্ধান পাওয়া। ভারতে মাস খানেক কাটাবার পর বোধ তার থিতু হয়েছিল। জীবন সম্পর্কে ভারতীয় অবলোকনের চোখ সব সময় বিপরীত গতি বা শক্তি-সম্পর্কিত। পথের ধারের ছোট তীর্থস্থান, মন্দির- ভারতের সর্বত্র। এই সাধারণ অথচ মৌলিক বিষয়গুলো তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছে। ভারতবর্ষের এ বিষয়গুলোর পরিপ্রেক্ষিতে জড়িয়ে আছে দ্বৈত দর্শন।

জীবনধারণ ও অর্থ উপার্জনের জন্য শিক্ষকতা করেছেন উলভ্যারহামটন পলিটেকনিকে। ইংল্যান্ডে থাকতে হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন। কাজ করার এটাও একটা কারণ। ভারতীয় পাসপোর্ট নিয়ে কর্মহীন বেকার হলে থাকার অনুমতি পেতেন না। শিল্পী শিল্পের কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা নেই। কিন্তু ব্যক্তিগত পরিচিতি, বোধের মানচিত্রে তিনি ভারতীয়।

ইংল্যান্ডে শিক্ষকতার সময় মনে হতো, শিক্ষা দানের চেয়ে শিখেছেন বেশি। বিশ্বাস করতেন শিক্ষা সৃষ্টি কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক বা তাত্ত্বিক কার্যক্রম নয়। মনে মধ্যে পুঞ্জীভূত ভাবনা ইচ্ছা, মুক্তি দেওয়ার পথ হলো কথা। এই পোস্ট ফ্রয়েডিয়ান যুগে ভাষা আছে যা সৃষ্টির বেদনা, আনন্দের স্তবগানকে শৃঙ্খলমুক্ত করতে পারে, অনন্ত একটা বিশেষ মাত্রা পর্যন্ত। আনীশের মানসভূমিতে বৈচিত্র্য ও বিস্ময়কর সমাবেশ। দেশের স্মৃতি মুদ্রিত হয়ে আছে তাঁর সত্তায়।

ভারতীয় জীবনে প্রকৃতিতে রঙের গুরুত্ব নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। মন্দির গাত্র থেকে প্রসাধন রঙের ঝিলিক- সর্বত্র। শুধু অলংকরণ নয়, রঙের রয়েছে ভিন্নতর দ্যোতনা, জীবনে প্রথম বিশুদ্ধ রং নিয়ে সৃষ্টির আরাধনায় ডুবেছিলেন- মনে হয়েছিল এক ব্যক্তিগত সত্যের সঙ্গে ভাব বিনিময় করছেন। রংকে তিনি অন্তঃগূঢ় চৈতন্য দিয়ে অনুভব করেছেন। লাল তাঁর লাইভমোটিভ বর্ণ, প্রথম কাজটি করেছিলেন লাল ও সাদায়। বৈপরীত্য নিয়ে খেলা, যা সৃষ্টির অন্তর্নিহিত সমস্ত সম্ভাবনাকে বিকশিত করে। রঙের এ খেলার স্থায়িত্ব নিয়ে তাঁর মধ্যে কোনো সংশয় ছিল না। তাৎক্ষণিক ভাবনা, সৃষ্টিটাই তখন গুরুত্বপূর্ণূ ছিল। আশির শুরুতে মনে হয়েছে, তিনি প্রকৃত অর্থে কোনো কাজই করেননি। আত্মবিস্তারে নিজস্ব স্বর তৈরির তাগিদ অনুভব করেছিলেন প্রবলভাবে। আঙ্গিক, রং, স্পেসের সমন্বয়ে একটা ভাষা- যে নির্মিতি প্রচলিত ব্যাকরণের সিলমোহর সাঁটা নয়।

শিল্পীর ভাবনা ও তাঁর শিল্পকে উপস্থাপনার ভেতর দৃশ্যময়তা একটা জরুরি দিক। আনীশ মনে করেন, তিনি একজন চিত্রশিল্পী, যিনি একজন ভাস্কর। আর ভাস্কর্য পৃথিবীতে সব সময়ই বর্তমান। চিত্রকর্মের জগতে উপস্থিতিটা

প্রয়োজনীয় নয়। এটাই চিত্রকলার চরিত্র। প্রকৃতিই চিত্রকলা। হতে পারে তা মনের বা আত্মার নিসর্গচিত্র, আর ভাস্কর্য হলো দেহের দৃশ্যচিত্র। তাঁর কাজে এই দুটো অনুষঙ্গই প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে পেয়েছে।

আনীশ কাপুর: দ্য ব্ল্যাক বিন / ২০১৬
আনীশ কাপুর: দ্য ব্ল্যাক বিন / ২০১৬
আনীশ কাপুর: ক্লাউড গেট / ২০০৬
আনীশ কাপুর: ক্লাউড গেট / ২০০৬

তাঁর প্রথম পর্বের কাজে স্পেসে মায়াময়, অলীক নির্মাণের ব্যাপারটা আছে। রঙের গুঁড়ার স্তর, স্তূপ সমতল ভূমিতে। রঙের এই বহুস্তরীয় বিনির্মাণে মেঝে দ্বীপের আদল নেয়। কখনোবা হিমশৈল- আংশিক প্রকাশ্যে, আংশিক মাটির ওপরে। রঙের এই বহুস্তরীয় রূপে এমন ইমেজ তৈরি হয়েছে, মনে হবে বাকি অংশটা মাটির নিচে অথবা দেয়ালের অন্য পার্শে¦। বেরিয়ে আসছে, ভেসে উঠছে।

স্বাতন্ত্র্য অর্জনের প্রচেষ্টা নয়, তাকে স্বাতন্ত্র্য করে তুলেছে ভাবনার মৌলিকত্ব, নির্মাণের প্রয়োগনৈপুণ্য, সুগ্রন্থিত গঠন ও গতিময়তা, স্বপ্ন ও বাস্তবের এক অভিনব খেলা। তার বিষয়বস্তু দৈন্যে ধ্বস্ত নয়। রং এবং এক বর্ণ শরীর ও বস্তুর ত্বক বা আবরণ আনীশের কাজ বিশ্লেষণে তিনটি জরুরি মাধ্যম। মিসরীয় পুরোহিতেরা চিত্রকর দিয়ে তাদের মনের কথা প্রকাশ করতেন, আনীশ একটি মাত্র রং দিয়ে নিজেকে নিবেদন করেন।

গঁ-প্যালের মনুম্যান্তার কাজ প্রসঙ্গে বলেছেন- ‘একটি বস্তু, একটি আঙ্গিক এবং একটি রং। সরলতা এবং সংযম তার সৃজনের অভিধানে যমজ দুটো শব্দ। ভাস্কর রদ্যাঁ বলতেন Simplicity, এই সাবলীল শব্দটি আনীশের চেতনা স্রোতে বিরাজ করে। মনুম্যান্তার প্রদর্শিত কাজের নাম লেভিয়াতঁ (Leviathan) সম্পর্কে বলেন, For me the huge archaic force is linked to Darkness. It is a monster burdened with its corps, which stands guard some forgotten regions of our conscience.

বাইবেলে লেভিয়াতঁ উল্লিখিত হয়েছে বহুবার, সাগরের অতিকায় দানব হিসেবে চিহ্নিত। বাইবেল ছাড়া জব (Job) এবং ইজাইয়া (Isaiah) আর অনেক স্তোত্র বা প্রার্থনা সঙ্গীত এই ভয়ংকর প্রাণীটির কথা আছে। বীভৎসটি দানবের মস্ত হাঁ করা মুখের মধ্য দিয়ে দুষ্ট আত্মা নরকে যাবে- ধর্মীয় গ্রন্থে লেভিয়াতঁকে চিত্রিত করা হয়েছে এভাবে। বলা হয় এই প্রাণীটি প্রাকৃতিক দুর্যোগও ডেকে আনতে পারে। এর সঙ্গে সাদৃশ্য এপোকেলিপাস জন্তুর। ভাঙন ঐতিহ্যবাহী সাগরের সাপের মোটিফ ছিল প্রাচীন সুমেরিয়ান আইকোন গ্রাফিতে তৃতীয় মিলেনিয়াম বি,সি তে। লেভিয়াতঁ এবং তার স্থল প্রতিরূপ বেহেমথ। ইহুদি ঐতিহ্যে চিত্রিত হয়েছে জন্তুরূপে যে পরাভূত হবে শেষ বিচারের সময়। আবার খ্রিস্টান মতে লেভিয়াতঁ মৃত্যুর প্রতীক। গভীর সমুদ্রে নিমজ্জিত হবার বা ডুবে মরার। বিশাল ঢেউ তার বজ্রঝড়কে ডেকে আনার শক্তি রাখে জন্তুটি। থমাস হোবেসের ক্লাসিক বইতে (১৬৫১) এ দানবটিকে রাজনৈতিক মেটাফর বা রূপকের সমার্থ শব্দতুল্য দেখানো হয়েছে- মানুষের বিরুদ্ধে মানুষের যুদ্ধ যা আদিম মৌলিক প্রকৃতি (সমাজগঠনের আগে)।

কিন্তু শিক্ষাকর্ম আছে, যা শব্দ দিয়ে বিশ্লেষণ করা যায় না। যা শুধুই অনুভবের। শরীরে নয় সভায়, অবয়বে নয় আত্মায়। আনীশ কাপুরের ভাস্কর্য বিশেষ করে লেভিয়াতঁ তেমনি আয়তনের ব্যাপকতার সঙ্গে আচ্ছন্ন তত্ত্ব, দর্শন আর প্রখর কল্পনাশক্তি মিথের অর্থকে গভীর করে তোলে। রঁদ্যার ‘চুম্বন’ জৈবিক আনন্দ বা যৌনতার প্রতীকের চেয়ে শুদ্ধতার চিত্রকলা। প্রেমের অভিব্যক্তি প্রকাশে ভাস্কর্য হয়েছে সাইকোলজিক্যাল স্টেটমেন্ট। আনীশের নির্মাণও মনোজগতের এক বিশেষ অবস্থাকে মূর্ত করে। তবে তিনি ঐতিহ্যের মধ্যে স্বতন্ত্র। প্রাচী বা প্রতীচীর প্রমিত বৃত্তে বন্দী নন।

মুনম্যান্তায় আনীশের নির্মাণ সম্পর্কে কিউরেটর জঁ দ্য লইজির কথা ফিকশন, দেহ আর রঙের সমন্বয়ে পঁয়ত্রিশ মিটার উচ্চতা নির্মাণের হার্দিক আবেদন এত বেশি, চোখের মায়ায় আটকে যায়। একবার তাকিয়ে যাকে আলিঙ্গন করা বা চোখে ছোঁয়া যায় না। এটা শুধু একটা বস্তু নয়। একটা গল্প, আকার, আয়তন, রং।

সব মিলে ১০ হাজার ৭০১ কেজি ওজনের আবরণ আর ৭২ হাজার বর্গমিটার এলাকাজুড়ে বিচ্ছরিত আলো। বিন্যাস পরিকল্পনার নিরিখে সুগঠিত শিল্পসৌন্দর্য লেভিয়াতঁ। পুরাণের অনুশীলনের এ কাজটি বাস্তবায়নে বড় ঝুঁকি ছিল ১০ হাজার ৭০১ কেজি ওজনের পাতলা পর্দার আস্তরণকে ফুলানো। প্রায় পঞ্চাশ জন লোকের প্রয়োজন হয়েছিল ভাঁজ করা এবং ছড়িয়ে স্থাপনের জন্য কোনো রকম ছেঁড়া ছিদ্র বা কুঁচকানো ছাড়া। এই বিপুল অবয়ব নির্মাণে যে প্রয়োগকৌশল ব্যবহৃত হয়েছে, তা প্রকৌশলী এবং শিল্পীর জন্যও প্রথম নিরীক্ষা।

আনীশ কাপুর: লেভিয়াথান (বাইরের অংশ) / ২০১১
আনীশ কাপুর: লেভিয়াথান (বাইরের অংশ) / ২০১১

সৃষ্টির সাবলীল ছন্দের সঙ্গে মিলিয়ে দেন, দিতে পারেন ধী-দীপ্ততা, সেই ধীশক্তির উপাসনায় তিনি স্থাপত্য মনোবিজ্ঞান, মিথ আর ভাস্কর্যের মিশেলে নির্মাণ করেন শিল্প। লেভিয়াতঁর অভ্যন্তরে দাঁড়ালে দেখা যাবে পাতলা পর্দার স্তর ভেদ করে একটা বিন্দু থেকে ভেতরের পরিধিতে অনেকগুলো রেখা ছড়িয়ে পড়েছে। মনে হতে পারে সৌরলোক থেকে উৎসারিত আলোর ধারা। মোট চারটি বৃত্তাকৃতির সমন্বয়ে গঠিত ভাস্কর্য দেখে কারও কাছে মনে হয়েছে জরায়ু বা নারীর স্ফীত বর্তুল স্তন্য। আবার বিচ্ছুরিত আলোর আভায় গোলাকার বৃত্তের ব্যাসার্ধের ভেতরে দাঁড়িয়ে দর্শকের মনে হতেই পারে আদি বিশ্বের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে সে। ভৌগোলিক সীমাহীন এক অনন্ত শূন্য। মাথার ওপর মহাশূন্য লাল। গোটা ব্যাপারটা রেটিনাল। দর্শকদের কল্পনা আর ভাবনার স্বাধীনতা তাতে আছে। আনীশের কাজে রঙের একটা ওজন আর চুম্বক টান- যা স্পর্শ করে স্নায়ুতন্ত্রকে।

গহ্বর, শূন্যতা আছে অনেক কাজে। এই শূন্যতার উৎসে আছে অনেক দর্শন, আবার একই সঙ্গে শূন্যতার বোধ ব্যাখ্যাতীত, গোটা প্রক্রিয়াটাই চূড়ান্ত বোধের অতলান্তে ডুবে যাবার। আনীশ কাপুর এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘তিনি চেয়েছিলেন দর্শকের স্মৃতি এবং দেহ একত্রে আসবে দেখার সময়।’ দর্শকদের রঙের সায়রে অবগাহন করাতে চান।

গতানুগতিক নয়, স্থাপত্যবিন্যাস ও উপস্থাপনের সৌকর্য অনেক কাজেই আক্ষরিক অর্থে যুগান্তর ঘটিয়েছেন তিনি। নিবিড় ঘন লাল প্রায়ই তাঁর কাজে দেখা যায় একটা মাধ্যম রূপে। যে রংটা প্রতিভাত হয় রাতে আমাদের চোখে। তার অস্থিত মনোক্রম চরিত্র রক্তের স্পন্দনগতি প্রকাশ করে। দেহের ভেতরের এই স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যাপন শিল্পীকে মোহিত করে। একটা সীমা পর্যন্ত লাল বর্ণ আমাদের চেতনায় থাকে। বিমূর্ত এবং কল্পনায় রং খুব শক্তিশালী আয়ুধ। তবে নিরপেক্ষ নয়। লাল অনেক বেশি মলিন ও বিষণœ ছায়া তৈরি করে দৈহিক এবং মানসিক স্তরে, কালো বা নীলের চেয়ে। এই মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণেও জরিত লেভিয়াতঁ। বক্তব্যে অপেরার মতো বৈভব ও বিস্তৃতি।

আনীশ কাপুর: মাই রেড হোমল্যান্ড / ২০০৩
আনীশ কাপুর: মাই রেড হোমল্যান্ড / ২০০৩

প্রদর্শনী চলাকালে বিখ্যাত স্থপতি জঁনভেল আর আনীশ কাপুরের এক মনোরম, ব্যতিক্রমী আলোচনা শুনেছিলাম। গ্যঁ প্লেতে ১৯ মে রাত আটটায়। বিষয়- আলো এবং স্বচ্ছতা, আবেগ এবং স্পেস অথবা ইমেজ এবং প্রতিফলন। শিল্পী এবং স্থপতি তাদের স্ব-সৃষ্টিতে স্পেসে আলো আর আবেগের পরিবেশ পরিস্থিতিগত সুখকর প্রযোজনার কথা বলেছিলেন। দিয়েছিলেন উৎসুক শ্রোতার প্রশ্নের উত্তর।

স্থপতি ও শিল্পী উভয়েরই সৃষ্টির ভিত্তি স্পেস। স্থপতির প্রধান অবলম্বন ভূমি- ভূমিপূজা, আলোছায়ার ঘনত্ব, তীব্রতা স্থাপত্যের ত্রিমাত্রিক ভাষায় বাঙ্ময়। স্পেস বিমূর্ত বিমূর্তকে সামনে রেখে কাজ করেন দুজনেই। সৃষ্টির মাধ্যম স্বতন্ত্র, অভিব্যক্তিও ভিন্ন। আর স্থাপত্য অন্যান্য লিবারেল আর্টের মতোই সেরিব্রাল, বৌদ্ধিক রচনা।

আনীশের স্পেসে শূন্যতার একটা ভিন্ন আর্ট আছে। এই শূন্যতাকে তিনি বলেন বিষয়হীন শূন্যতা স্পেসের মধ্যের বিষয় আর বিষয়হীনতা, স্বীকৃতি ও ক্যাওস বা বিশৃঙ্খলা। যুক্তির সঙ্গে যুক্তিহীনতা মিলিয়ে নিরীক্ষার প্রয়াস।

বহু সত্তায় জড়িত তার শূন্যতা, গহ্বর ও শূন্যতা, এই শূন্যতার উপস্থিতি নানা আঙ্গিকে, মেজাজে। শূন্যতা যেহেতু ভয়, ভীতি প্রকাশ করে, গুহা, জরায়ুর চিত্রকল্পেও শূন্যতা। ভয়, মাথা ঘোরানো, পতন বা ভিতরের দিকে আর্কষণ করা- নানা মানসিক ও শারীরিক প্রতিক্রিয়া তৈরির দিকে শিল্পীর প্রবণতা। এই বিপর্যয় বা অবস্থানের পরিবর্তনে সম্পৃক্ত তন্ময় আঁধারের দর্শন। ভয়টা অন্ধকার। দৃষ্টি অনিশ্চিত জেনে হাত বাড়িয়ে দেওয়া হয় স্পর্শের আশায়, এমন অবস্থায় একমাত্র কল্পনায় সম্ভব পলায়নের।

শূন্যতার গভীর গোপন ভাষা মূর্ত হয়েছে মাধ্যমের বিভিন্ন মাত্রায়। বিষয় এবং বিষয়হীনতা, উপস্থিতি আর অনুপস্থিতি। কে আছে এবং কে নেই, কী ও কে মূলত মধ্যবর্তী- প্রশ্নগুলো থেকে উন্মুক্ত হয় তৃতীয় সত্তার বা থার্ডনেসের। এ প্রসঙ্গে হ্যারল্ড আরনেল ও জনি মারসের গান- Accentuate the positive eliminate the negative, but don’t mess with Mr. Inbetween.

আনীশ ইন বিটুইন বা মধ্যবর্তীকে স্বীকার করেও মনে করেন, আসলে মধ্যবর্তী বলে কিছু নেই। শূন্যতার ওপর তার কাজগুলো কাব্যিক ও আধ্যাত্মিক ধারণায় সিক্ত। মধ্যবর্তী বা মাঝখান হলো একটা সাংস্কৃতিক নিশ্চয়তার ব্যাখ্যা। কারও সাংস্কৃতিক সংশয় বা অনিশ্চয়তা নয়।

স্বপ্ন ও বাস্তবের মধ্যে থাকে এক অন্তহীন শূন্যতা। বহুপুঞ্জ এবং সময় বিনিময়। ওজনটা উপস্থিত এই উপস্থিতিটা এক ধরনের স্বপ্ন তৈরি করে বা করতে পারে। মাইকেলেঞ্জেলোর বিখ্যাত উক্তি - ‘The sculpture was ready inside the stone & he had just to free it.’ - বক্তব্য সর্বত্র ভুলভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পাথরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একধরনের মানসিক ও ইমোশনাল শক্তি। যা তার মধ্যে বিরাজমান। পরিপূর্ণ সম্পন্ন পাথরটিকে কাজের মধ্য নির্মাণ নয়- তার সজল উর্বরতার অর্গল খুলে দেওয়া হয়। সৌন্দর্য হলো আতঙ্কের উৎস- বিশ্বাস করতেন রাইনে মারিয়া রিলকে। এ ধারণা মূর্ত করে অনুভূতির বৈপরীত্য ভীতি ও ইচ্ছার আলো ও আঁধারের দ্বৈততায় গভীরভাবে সংযুক্ত একই অনুভব। অন্তর্লোকের গহিন গহনেই এর অভিযান। আনীশ কাজ করেন ভাস্কর হেনরি মুরের দেশে। হয়তো সে কারণে অবচেতনে শূন্যগর্ভ, কোটর, গুহা তাঁর রচনায় বিশেষ স্থান নিয়ে আছে- ভাবেন অনেকে। কিন্তু আনীশের প্রেক্ষিতের ইতিহাস ভিন্ন। শৈশবে দেখেছেন এলিফান্টা গুহা, কৈশোরে চৌদ্দ-পনেরো বছর বয়সে দিল্লিতে যন্তর-মন্তর দেখার ইমেজ তাঁর অবচেতনে কুঁড়ি হয়েছিল। তিনি পোস্ট ফ্রয়েডিয়ান ভাষার কথা বলেছেন। ফ্রয়েড বলেছেন, চেতন স্তরের তলায় রয়েছে ‘ইউ’ প্রিকনশাস, সে স্তর সংলগ্ন স্তর সুপার কনশাস-চৈত্যমন। এই মন আধ্যাত্মিক, তার কাজে এই দেখাটা সুফিসুরের মতো বাজে। আর মুরের কাজের গহ্বর বহুর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত। তার ফলে এক শূন্য স্পেস বা গর্ত তৈরি হয়েছে। কিন্তু আনীশের বিষয় ভিন্ন। তিনি কাজ করেন নেতিকে নিয়ে, বিশেষ উপলব্ধিতে। ইতিবাচক কিছু নেই। নন-অবজেক্ট তার কাজের অনুভূতিটা এমন অভ্যন্তরস্থ: এমন এক অবস্থা, যা বর্ণনা করা যায় না। ব্রাঁকুসির কাজের বিপরীত, ফর্ম তৈরি নয়, তার ঝোঁক নন-ফর্ম তৈরিতে। কারণ, তিনি বহুর ভেতর স্পেস চান। লেভিয়াতঁ-তে তিনি স্পেসের ভেতর স্পেস রচনা করেছেন। রং নিয়ে খেলার জন্য বা অন্যভাবে বলা যায় বহুর ভেতরের স্পেসে রঙের ভূমিকা নিয়ে খেলতে চান। যেমন ঘন নীল রং ব্যবহার করে গড়নকে মূর্ত করেন না, বরং গড়নকে অস্বীকার করেন।

সত্তরের শেষে এবং আশির প্রথম দিকে ভাস্কর্যগুলো করেছেন পুরোপুরি রঙে আবৃত করে। তার পিগমেন্ট পর্বের কাজে নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টি পরিবাহিত হয়েছে। অবয়বহীনতা সাবয়ব করার উপকরণ হয়েছে রং। টার্নারের কাজে রংটা আলোর বার্তা বহন করে। আনীশের দৃষ্টিতে বর্ণিলতা ক্রমশ আঁধারে ডুবে যায়।

শিল্পীর রচনায় রং খুব জরুরি, রং তার অবচেতনার নিগূঢ় বার্তা, লালকে তিনি চান সজল, ঘন, ভারী অথবা শুকনো- পরিপূর্ণ অবস্থা বোঝাতে আর রং ব্যবহারের এই কারুঝলক শিল্পীর মানসিকতার অ্যানাটমি। লাল জন্মমৃত্যু, উষ্ণতা, বিপ্লব, ক্রিস্টান সেক্রামেন্টে লাল মদিরা, বিশুদ্ধ রক্তের প্রতীক, লাল কোনো না কোনোভাবে পুরাণের সঙ্গে সম্পৃক্ত। লালে সুপ্ত আছে আঁধার, যা আলোর চেয়ে উজ্জ্বল।

কাজে প্রথম ধূসর ব্যবহার করেছেন নিসর্গ, মেঘ ভাবনায়। কিন্তু ধূসর বর্ণের সঙ্গে তার সংলাপটা ভিন্ন। খুব স্বস্তি পান না এ রঙের সঙ্গে সহবাসে। বলেন- ধূসরের বিষণœতার যে চেহারা, সে একান্তই শিল্পীর। মন্ত্রিয়ানকে মনে করেন অথেনটিক রিয়েলিস্টিক শিল্পী, তাঁর কাজ বিমূর্ত নয়, রিয়েলিস্টিক। তাতে রঙের ভূমিকা অনেক, তার কাজে সবুজ নেই। কারণ, তাতে এই রং ব্যবহারের কোনো যুক্তি নেই। নিসর্গ বাইরের, সবুজ ভেতরের রং নয়। নীল আর হলুদ, সাদা, লাল ও কালোও।

ডিসেন্ট ইনটু লিম্বো করেছিলেন ’৯২ সালে। ইতালীয় রেনেসাঁর শিল্পী মন্ডেগনার ‘ক্রাইস্ট ডিসেন্ট ইনটু লিম্বোর ভাবনায়, কিন্তু অসাধারণ মেটাফোর প্রতীক মুদিতার স্বশৈলীতে। উপস্থাপন করা হয়েছে এমন এক ভাবাচ্ছন্নতা, সত্তা ডুবে যায়। চৈতন্যের জ্যোতি লুপ্ত হয়ে মিশে যায় হিরণ¥য় আঁধারে। এ অবস্থাকে বলছেন ‘পোয়েটিক সুবলিম (Poetic Sublime) আঠারো শতকের দার্শনিকদের দীপান্বিত দর্শনের এ শব্দটি মনোজগতে অনবরত ক্রিয়াশীল। বস্তুত ডিসেন্ট ইনটু লিম্বো’ (৬x৬মি) মেঝেতে গর্তসহ আর এই গর্তটি মেঝের সমান্তরাল সমতলে, সমরূপে করা। ঘন নীলে রঞ্জিত। কাজটি দেখতে আগ্রহী দর্শকদের ভিড় দরজার বাইরে। পঁয়তাল্লিশ মিনিট ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে একজন দর্শক ঘরে ঢুকে কাজটি দেখে রীতিমতো ক্ষুব্ধ। কারণ, দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর ঘরের মধ্যে একটি কালো কার্পেট দেখল। সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না, এটা একটা গর্ত। তার কাছে ওটা ছিল নিছক কালো কার্পেট, এই বিচিত্র অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে শিল্পী বলেন- ‘আমার কাছে এটাই রচনার সার্থকতা তার মানে আমার প্রকল্পটি চোখে বিভ্রম সৃষ্টি করেছে। শূন্য সত্তার বিশালতা- এই যে শূন্যতাকে ভরাট করা বা অন্য ধরনের শূন্যতা তৈরি করা বোধকে জাগ্রত করা- শূন্যতা শূন্যতা নয়, এই চেতনা স্রোত একই সঙ্গে মানসিক ও কাব্যিক।

সৌন্দর্য এবং মৃত্যু পারম্পর্যবোধ ও প্রাসঙ্গিকতায় সমন্বিত। জীবনে প্রকৃত সুন্দরের অভিজ্ঞতা দিতে চেয়েছেন। সৃষ্টি স্থিতি বিনাশ ইভেন্টটাই শিল্প। পরিপ্রেক্ষিত বিবর্জিত তাত্ত্বিকতা নয়, জীবনলগ্ন বোধই গভীর দর্শন হয়ে কাজ করেছে তার ভেতরে। ঘটনা হয়ে ওঠা এবং শেষ হওয়াটাই শিল্প।

জন্মভূমি ভারতের অগণিত চমৎকার উপাদানের মাঝে আছে অনেক ঘটনা, উপকরণ- যা তৈরি করে উদ্বেগ কষ্ট, পীড়ন, দারিদ্র্য- এই অবস্থাগুলো একে অপরের সমান্ত রূপ। একই সুতায় গাঁথা প্রকৃতির এক অপ্রতিরোধ্য বিপ্রতীপের সহাবস্থান।

ফিজিক্যাল ইনভলভমেন্ট বা কায়িক শ্রমের চেয়ে বেশির ভাগ কনসেপচুয়াল আর্ট স্থাপনা এখন অনেকটা মুড বা ফ্যাশন। বুঝে না-বুঝে অসাড় তত্ত্ব ও নির্মাণ কিন্তু আনীশ কাপুরের কাজ কনসেপচুয়াল আর্টের কোলাহল ব্যাকরণ নয়। ব্রা, আর্মি প্রিন্ট, চে গুয়েভারা, মনরোর মতো আইকনের প্রতিকৃতি ব্যবহার করে শিল্প বা স্থাপনা নির্মাণের চমক নয়। সাধারণ দর্শকদের জন্য আনন্দ উদ্দীপক অভিজ্ঞতা আর শিল্প রসিক বোদ্ধাদের জন্য দর্শনের যুক্তিপূর্ণ অর্ন্তপাঠ আনীশ কাপুরের শিল্প। যুদ্ধোত্তর ইউরোপ আমেরিকার বিভিন্ন শিল্প আন্দোলনের মধ্যে কনসেপচুয়াল আর্ট ছিল (হ্যাপেনিং তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত)। কনসেপ্ট বা ধারণার পরিণাম সৃষ্টি, বলা যায় শিল্প। তবে তাঁকে চিত্রকলা বা ভাস্কর্যের সিলমোহর দিতে হবে, এমন কোনো আইন নেই। বছরের পর বছর কাজ করে একটা ভাষা রপ্ত করেছেন আনীশ। রঙের ভাষা, শূন্যতার ভাষা, আয়নার ভাষা, মোমের ভাষা ছাড়াও অন্যান্য কাজ। এসব কাজের পরম্পরায় যোগসূত্র রয়েছে। আবার বিভিন্নভাবে বিভিন্ন আঙ্গিকে রয়েছে স্বতন্ত্রতা। মূল ভাষার সঙ্গে উপভাষার সম্পর্কের মতো।

সাম্প্রতিক সময়ে শিলী বলেছেন কম্পিউটার সিলিকনে বাঁধা শক্তিতে। এই প্রযুক্তির সহায়তায় উদ্ভাবিত কাজ। সময় কাল ও প্রেক্ষাপট মিলিয়ে তিনি নির্মাণ করেন ভাস্কর্য। তাঁর কাজের অন্তস্থ যুক্তিতে মিশে থাকে বয়ানের যুক্তি, গঠনসংক্রান্ত যুক্তি এবং পূর্তবিদ্যার যুক্তি। কিন্তু তার ভাস্কর্য এত বেশি নিখুঁত মনে হবে যে ডিজাইন কারখানা উৎপাদিত পণ্য। স্থাপত্য বিন্যাসের সংরাগে তৈরি ভাস্কর্যগুলো থেকে সমালোচকদের নেতিবাচক ভাবনা হয়েছে। আনীশ কাপুরের কাজে আরবান প্ল্যানার বা নগর পরিকল্পনাবিদদের প্রবণতা লক্ষ করা যায়। শিল্পী মনে করেন পারফেকশন বা নিখুঁত, নির্ভুল শব্দটা বিতর্কমূলক, পরিবর্তনশীল ও আপেক্ষিক। কাব্যিকভাবে তা ব্যবহৃত হয়। যখন কোনো সৃষ্টিতে পারফেক্ট শব্দটা জুড়ে দেওয়া হয়। তখন হাতে রচিত শিল্পটির অবয়ব, প্রকৃতি পরিমিত বা অভিশ্রুত হয়ে যায়। যেমন ডোনাল্ড জুডের কাজে শেষ পর্যন্ত কোনো অভিব্যক্তি থাকে না; নেই তাতে রোম্যান্টিসিজমের চিন্ময় ব্যাগ্রতা।

নিরালম্বন শূন্যতা যে স্পেসে, সে স্পেস হলো দার্শনিক অস্তিত্ব বা ফিলোসফিক্যাল এনটিটি। এই মনস্তাত্ত্বিক দর্শন জুড়ে আছে তাঁর চেতনার দ্রাঘিমায়। সাফল্য আর স্বীকৃতির নানাবিধ পালকের বর্ণচ্ছটা সমৃদ্ধ তার শিল্পীজীবন। ১৯৯১ সালে বিখ্যাত টার্নার পুরস্কারসহ অজস্র সম্মানিত পুরস্কার। নির্বাচিত হয়েছেন রয়াল একাডেমির সদস্য, কমান্ডার অব দ্য অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার (২০০৩) ব্রিটেনের সর্বোচ্চ সম্মানজনক প্রতিষ্ঠান বোর্ড আর্ট কাউন্সিলের সদস্য, টেট মডার্ন বোর্ড অব ডিরেক্টর। গুগেনহেম লুভ্র, রয়াল একাডেমি, টেট মডার্নসহ বিশ্বের বিভিন্ন গ্যালারিতে তার প্রদর্শনী হয়েছে। ২০১২ সালে লন্ডন অলিম্পিকের জন্য করেছেন ১২৫ মিটার উচ্চতার একটি টাওয়ার। ‘অরবিট’ শিরোনামের নির্মাণটি যৌথভাবে করেছেন সেসিল বালমন্ডের সঙ্গে।

আনীশ কাপুরের অনেক মাইলস্টোন কাজের মধ্যে একটি কাউড গেট (২০০৪)। নিজস্ব ভঙ্গিমায় শ্রমে পূর্ণ সৃষ্টি। দেখে মনে হবে ইউএফও (UFO) অবতরণ করেছে শিকাগো মিলেনিয়াম পার্কে। মৌলিক ভাবনা ও প্রযুক্তির যৌথ চর্চা। তার ব্যাপক অবয়ব নিয়ে আশপাশের সমস্ত গগনস্পর্শী ভবনগুলোর দ-কে যেন শুষে নিয়েছে। একই ব্যাপার ঘটেছে নিউইয়র্কের ‘স্কাই মিরর’ (২০০৬)-এর ক্ষেত্রে। বিশাল গোলাকৃতি আয়নার স্থাপনাটিতে বিম্বিত হয়েছে রকফেলার সেন্টার ভবনসহ আকাশের অসীমতা। মহাকাশের নীল শূন্যতা। এটাকে দেখে অনেকে ভাবতে পারেন মেগা টেলিস্কোপের কথা। যার শক্তিশালী দর্পণে ধরা পড়েছে রহস্যময় ছায়াপথের দ্যুতি। কিংবা আর্কিমিডিসের গল্প। প্রচলিত লোকগাথা সিরাকস অবরোধ করা রোমান নৌবহরে আগুন দিয়েছিলেন, বিশাল আয়নার প্রতিফলিত সূর্যরশ্মিকে ব্যবহার করে। গত পনেরো বছরে আনীশ কাপুর যিনি একসময় প্রকৌশলী হবার কথা ভেবেছিলেন, ক্রমশ সৃষ্টির কম্পাস ঘুরিয়ে ঘনিষ্ঠ হয়েছেন মনুমেন্টালিটির বড় হরফ এম (M) এ।

আনীশ কাপুর: দ্য স্কাই মিরর / ২০০৬
আনীশ কাপুর: দ্য স্কাই মিরর / ২০০৬

তারাতানতারা (Taratantara) (১৯৯৯) বাল্টিক সেন্টার ফর কনটেম্পরারি আর্ট এর জন্য করেছিলেন। নিউ ক্যাসেলের কাছে এই সেন্টারে করা কাজটি লাল আস্তরণ দিয়ে গুহার মতো স্থানটি এমন রূপ দিয়েছেন, মনে হবে একটা সেতু, টানেল অথবা জায়েন্ট ক্যালাইডোস্কোপ। কয়েক বছর পর টেট মডার্নের টারবিন হলের জন্য করেছিলেন মারাসিয়াস (২০০২) ইউনিলিভার সিরিজের অংশ হিসেবে। এখানেও তিনি লাল পিভিসি ফ্যাব্রিকের প্রসারিত পর্দাকে ব্যবহার করেছেন। চেতনায় আচ্ছন্ন বিস্তারী লাল প্রটো (Proto) কালার।

অন্যদিকে লালের ছায়ায় জড়িয়ে থাকে হলুদ। হলুদ হলো আলো। চেতনায় আচ্ছন্নবিস্তারী লাল। আনীশের লালে শব্দের মতো নিজস্ব মত মুড আছে। তার আভায় মূর্ত যে প্রতীক তাকে প্রস্ফুটিত ফুল বা সিংগাজাতীয় বাদ্যযন্ত্র বলে মনে হবে। মারসিয়াস সৃষ্টির অনুপ্রেরণা তিশিয়ানের ‘দ্য ফ্লাইং অব মারসিয়াস’ (১৫৭৬) তিশিয়ানের শেষ পর্বের কাজ। সাতির অনন্য সংগীত প্রতিভায় দেবতা অ্যাপোলো ঈর্ষান্বিত। রোষে জীবিত মারসিয়াসের চামড়া তুলে শাস্তি দেওয়া হলো। গ্রিকমিথের এই চিত্রকে আনীশ রূপ দিয়েছেন এবং বিশাল লাল পিভিসি (চঠঈ) মেমব্রেনকে প্রসারিত করেছেন তিনটি বড় রিংয়ের সঙ্গে যুক্ত করে। টেনে প্রসারিত লাল আস্তরণটি আনীশের ভাবনায় সাতির চামড়াহীন রক্তাক্ত দেহের উপমা।

আনীশ ভাস্কর্যের সারফেসকে তক্ব কল্পনা করেন। প্রথম দিকের কাজে রঙের স্তর তক্বের মতো ব্যবহার করেছেন। এসব শুধু তাঁর কাজে মানুষের দেহের রেফারেন্স নয়। অন্যান্য প্রধান রং হলুদ, নীল এবং সাম্প্রতিককালে ধূসর বিদ্যমান। তাঁর কাজে রূপক শোভিত। রূপান্তরিত দেহাবয়ব থেকে উন্মুক্ত করেন গোপনাংশ। ‘মারসিয়াস’ এবং তারাতানতারা কাজ দুটিতে স্ত্রী জননেন্দ্রিয়ের অনুষঙ্গ স্পষ্ট। মানবজন্মের উৎস মাতৃগর্ভ। ভ্রƒণের আচ্ছন্নতা ও অবরুদ্ধতা এই অনুভবের চিত্রকল্পও হতে পারে এই গহ্বর ত্বক, রং ও দেহ তিনটি চরিত্র দিয়ে ভাস্কর্যের চিত্রনাট্য তৈরি করেন তিনি।

‘শুটিং ইনটু দ্য কর্নার’ (২০০৮) স্বয়ম্ভু (২০০৭) করেছেন রক্ত লাল মোম দিয়ে স্বয়ম্ভু সংস্কৃত শব্দ। অর্থ স্ব-প্রজনন বা স্ব-সৃষ্টি। আনীশের শিল্পের সাংকেতিক ভাষার উৎসে আছে মনোজগৎ আর বিমূর্ত কারণটা সামাজিক পরিবেশের মধ্যেই আছে।

আনীশ কাপুর
আনীশ কাপুর

আশির দশকের শুরুতে আনীশ যখন শিল্পচর্চা করছেন, তত দিনে বিশ্বায়িত পৃথিবীতে অভিব্যক্তিবাদ প্রচলিত ঘরানা থেকে বেরিয়ে নতুন আঙ্গিক নিয়েছে। বিশেষ করে জার্মানির ‘নিউফভ’ আর ইতালির ‘ট্রান্সআঁভগার্দ’ শিল্পীরা চিন্তার তাত্ত্বিক কাঠামো আর মননের দীক্ষাগুলো শাণিত করছে সম্ভাবনার প্রশস্ত রাজপথে। আনীশ কিন্তু এ দুটো ধারার ছায়া বাঁচিয়ে স্বতন্ত্র সড়কে হেঁটেছেন? বরং তার কাজে মধ্য-ষাটে জন্ম নেওয়া আমেরিকার মিনিম্যালিজমের ছোঁয়া লেগেছিল।

গত বিশ বছরে দেওয়া প্রতিটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘প্রথম বিষয় আমি বলতে চাই যে আমার কিছুই বলার নেই।’ কারণ, তার শিল্পই মননলোকের চিহ্নিত বয়ান। প্রকৃতি তাকে প্রাণিত করে। এলিফান্টা গুহা, অস্ট্রেলিয়ার উলুরু মনোলিথ (আইয়ার্স রক) থেকে প্রকৃতির আদিম আর্কিও পোয়েটিক ইমেজে রয়েছে একনিষ্ঠ ও নির্জনমুগ্ধতা। কারণ, এই প্রতীক প্রতিমাগুলো প্রাকৃতিক, অসংস্কৃত মনের স্পর্শ তাতে নেই। সবকিছুর শুরু দেহ থেকে শিল্পীর ভাষ্য। তাই দেহ থেকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রামাণিক চিহ্নকে সরিয়ে আবরণহীন যে নগ্ন কায়া- সেটাই হিউম্যান মিনিম্যালিজম। চিত্রশিল্পী লুসিয়ান ফ্রয়েডের চিত্রকর্মে যেমন শরীরের ভেতর বাহির চামড়ার স্তর ভেদ করে ধরা দেয় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, ভিসেরা রক্ত। আনীশের ভাস্কর্যও আছে আমাদের মৌলিক অনুভব- আন্তরিকতা ভাবাচ্ছন্নতা জীবন সম্পর্কে প্রশ্ন এবং আরও অনেক কিছু। তাই শিল্পীর কিছু বলার না থাকলেও নির্মিত শিল্পকর্মই তার সাইকো-বায়োগ্রাফি।

শিকাগোতে কাউড গেট (২০০৪) দেখতে হাজার দর্শক ভিড় করেছে প্রতিদিন। শিল্পীর মনে হয়েছে, তিনি একটি জনপ্রিয় জিনিস তৈরি করেছেন। পুপলার-জনপ্রিয় জিনিসটিকে তিনি ঘৃণা করেন। মানুষ যদিও বলেন, জনপ্রিয় মানে ভালো। দুই সপ্তাহ শিকাগোতে কাটিয়েছেন এবং কাজটি প্রতিদিন দেখতে যেতেন, পরে চারপাশের এই হুল্লোড় কাটিয়ে ভেবেছেন- জনপ্রিয়তার চড়া মেকআপ ছাড়িয়ে কাজটি ভিন্নমাত্রায় যেতে পেরেছে কি না।

নিজের মতো আধুনিক হতে চেয়েই স্বতন্ত্র তিনি। গন্ডি না মানা এসব দৃশ্যকলা ভাস্কর্যসমূহ। শিল্প ও প্রযুক্তির এত উদ্যাপন আর কোনো ভাস্করের কাজে দেখা যায় না। মাধ্যম প্রযুক্তি ও অভিব্যক্তির ভিন্ন বয়ানে আনীশ কাপুরের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কাজ স্বয়ম্ভু (২০০৭) তেমেনস (২০০৬) সেসিল বালমন্দের সঙ্গে যৌথভাবে করা। নন অবজেক্ট (ডোর), নন অবজেক্ট পোল, নন অবজেক্ট (ভাটিগো) ২০০৮, শুটিং ইনটু দ্য কর্নার (২০০৯), স্পেস এজ অ্যান অবজেক্ট (২০০১), ইয়ালো (১৯৯৯), গোস্ট (১৯৯৭), হোয়েন আই অ্যাম প্রেগনেন্ট (১৯৯২), ডিসেন্ট ইনটু লিম্বো (১৯৯২), গ্রেম্যান ক্রাইম শামান ডাইস বিলোউইং স্মোক বিউটি ইভোকড (২০০৪-০৯), সি-কার্ভ (২০০৭), মাই রেড হোমল্যান্ড (প্রায় পঁচিশ টন লাল মোম ব্যবহার করেছেন কাজটিতে) (২০০৩), ডিজ মেম বারমেন্ট সাইট (২০০৩-২০০৯)

তথ্যঋণ: গঁ-প্যালের প্রদর্শনী উপলক্ষে প্রকাশিত ডোসিয়ার: লো ফিগারো এবং আর্ট প্রেস পত্রিকা: আনীশ কাপুরের সাক্ষাৎকারভিত্তিক গ্রন্থ ‘আই হ্যাভ নাথিং টু সে’