সুজান ভ্যালাডান: মডেল থেকে চিত্রশিল্পী

তুলুজ লুত্রেক: দ্য হ্যাংওভার (মডেল সুজান ভ্যালাডান)

ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে একদল শিল্পী নতুন আঙ্গিকে শিল্পধারাকে আধুনিক করার প্রয়াসী হলেন। তাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে তাৎক্ষণিক সূর্যের আলোকে সঠিক সময়ে ক্যানভাসে ধরে রাখা এবং রঙের যথাযথ বৈজ্ঞানিক প্রয়োগবিধি অনুসরণ করা। যারা এই ধারার প্রবর্তন করেন, তাদেরকে আমরা বলি ইম্প্রেশনিস্ট। শিল্পতাত্ত্বিক দিক দিয়ে বিবেচনা করলে ইম্প্রেশনিজমের গুরুত্ব অনেক বেশি।

এই লেখনীর কেন্দ্রীয় চরিত্রে যিনি আছেন, তিনি হচ্ছেন সুজান ভ্যালাডান। যিনি ইম্প্রেশনিজমের সময়ে অনেক কালোত্তীর্ণ বিদগ্ধ শিল্পীর মডেল হয়েছিলেন, যেমন অগাস্ত রেনোয়া, এডগার দেগা, বার্থ মরিসত, তুলুজ লুত্রেক প্রমুখ। তিনি নিজেকে শিল্পকর্মের উপজীব্য হিসেবে উজাড় করে দিয়েছেন।

উল্লেখ্য, মডেলদের জীবন যেন জীর্ণ পাতার মতো পরিশ্রান্ত, অনিশ্চয়তার মায়াজাল পেতে যেন মনে হয় কেউ পাহারা দিচ্ছে। আমরা সবাই বেশির ভাগ শিল্পী, শিল্প, পৃষ্ঠপোষক, গ্যালারি ও সংগ্রাহক নিয়ে লিখে থাকি, তবু শিল্পীর মডেল নিয়ে লেখার প্রয়োজনবোধ করি না, যারা শিল্পকর্মের নেপথ্যের নিগূঢ় মানুষ। আমি এখানে সেসব মডেলের কথা বলছি, যারা নিতান্ত পেটের দায়ে বা জীবিকার তাগিদে মডেল দিচ্ছেন। উপরন্তু প্রত্যেক মানুষই মডেল- কেউ পেশাদার, কেউ অপেশাদার বা শৌখিন মডেল। পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত মানুষ শিল্পীকে মডেল দিয়েছেন। তবে যারা অপেশাদার মডেল, তাদের প্রধান কারণ হচ্ছে শিল্পীর ক্যানভাসে নিজের ব্যক্তিত্বকে দীপ্তিময় করে তোলা। কতিপয় মডেল প্রাণপ্রতিম শিল্পীদের দ্বারস্থ থেকে নিজেকে স্বমহিমায় উদ্ভাসিত করেছেন যেমন রদ্যাঁ, যাকে মৃত্যুর কিছুদিন আগে বিয়ে করেন। তিনিও মডেল ছিলেন, নাম রোজ বিউরেট। তাদের একটি সন্তানও ছিল। লিডিয়া করবেট যিনি পিকাসোকে মডেল দিয়ে বিখ্যাত হয়েছেন। তিনিও একজন চিত্রশিল্পী।

সুজান ভ্যালাডানের জন্ম ফ্রান্সের একটা ছোট্ট শহরে, ২৩ সেপ্টেম্বর ১৮৬৫ খ্রি। তিনি ছিলেন অবিবাহিত, ধোপানির কন্যা। সারা জীবন নিজের জীবনবৃত্তান্তে পিতার নামের জায়গা ফাঁকা রাখতেন। এমনকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাঁটাতারবিহীন বেষ্টনরেখা পেরিয়ে আসতে পারেনি, মাত্র এগারো বছর বয়সে জীবনযুদ্ধের নির্মম হাতিয়ার বহন করা শুরু করেছিলেন। প্রথমে কাজ করেন স্ত্রীলোকের টুপির কারখানায়, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জয়মাল্যের কারখানায়, সবজি বিক্রেতা হিসেবে, এমনকি রেস্টুরেন্টের ওয়েট্রেস হিসেবে অবশেষে সার্কাসের অ্যাক্রোবেটসের কাজ নিলেন। এক বছর পরে একদিন খেলা প্রদর্শনকালে শরীরচর্চার যন্ত্র থেকে নিচে পড়ে পিঠে আঘাত পান তিনি।

সত্যিকারে জীবনকে জীবন দিয়ে সংজ্ঞায়িত করতে হয়। জীবন যেমন অন্তবিহীন পথ হেঁটে শেষ করা যায় না, তারপর আবার সে পথ সুচারু বা সুবিন্যস্ত নয়, পথিমধ্যে নানা প্রবঞ্চনা, তবু মানুষ হেঁটে চলছে। যদিও জীবন প্রবহমান নদীর মতো কোথাও থেমে থাকে না। সুজানের বোহেমিয়ান জীবনও সে রকম সাক্ষ্য বহন করে। সেই দুর্ঘটনার পর সুজানের

নিষ্প্রভ জীবনের মোড় অন্যদিকে ঘুরে যায়। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে কিছু শিল্পীর সঙ্গে সখ্য তৈরি হয় এবং তাকে নানাভাবে সহযোগিতা করে। ফলে সুজানের সৌন্দর্য বা অবয়বে আদর্শবাদিতা নজরে পড়ে শিল্পীদের।

সুজান ভ্যালাডান: দ্য ব্লু রুম

শুরুতে লুত্রেক তার নাম মারিয়া ভ্যালাডান পরিবর্তন করে সুজান ভ্যালাডানে রূপান্তর করেন। তখন থেকে এখন অবধি তার নাম সুজান ভ্যালাডান। শিল্পীদের মডেল দিতে গিয়ে শিল্পী ও শিল্প - দুটির প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়। প্রত্যুৎপন্নমতি সুজান সিদ্ধান্ত নেন ছবি আঁকা শেখার। সবার কাছ থেকে ছবি আঁকা শেখেন এবং দেগাকে গুরু মানেন। এরই মাঝে নানা অন্তরায় পিছু ছাড়েনি। এর মধ্যে অবৈধ পুত্রসন্তানের জন্ম দেন তিনি। যদিও সেই পুত্র একদিন স্বনামধন্য শিল্পী হন। ছবি আঁকা শুরুর আগেই কালো রং দিয়ে অতীতের কালো অধ্যায় মুছে ফেলেন। ১৮৯৬ সালে এক ব্যাংকারের সঙ্গে বিয়ের পর পুরোদমে কাজ শুরু করেন। খোদ দেগা সুজানকে ছবি আঁকায় উৎসাহিত করার জন্য অনেক ছবি ক্রয় করেন। ১৯১৫ সালে সুজানের প্রথম একক প্রদর্শনীতে দর্শক, সমালোচক, সংগ্রাহক- সবার কাছে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা পায়। এটা সুজানের শিল্পী জীবনের সমূহ সম্ভাবনার পথকে সুগম করে দিয়েছে এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথমে তিনি নিজেকে অপ্রতিরোধ্য মহিলা শিল্পীর আসনে বসাতে সক্ষম হন। তাঁর কাজে স্বকীয়তা থাকলেও পোস্ট ইম্প্রেশনিজম ও ফোবিজমের প্রভাব পরিলক্ষিত। বিশেষ করে সুজানের চিত্রকর্মে বলিষ্ঠ লাইনের আধিক্য খুব বেশি প্রতীয়মান। উল্লেখ্য, দেগা সেই লাইনের গুণমুগ্ধ ভক্ত।

১৯৩৮ সালে বাহাত্তর বছর বয়সে নিজের স্টুডিওতে ক্যানভাসের সামনে চিত্রাঙ্কনরত অবস্থায় স্ট্রোক করে না-ফেরার দেশে বসতি স্থাপন করেন। তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় অনেক মহান শিল্পী উপস্থিত ছিলেন। যেমন পাবলো পিকাসো, জর্জ ব্রাক, আন্দ্রে ডেরেইন প্রমুখ।

ইতালীয় রেনেসাঁর একজন প্রবক্তা লিওবাতিস্তা বলেছিলেন, ‘মানুষ আপন স্বকীয়তায় এবং স্বধর্মে যেমন তার ভবিষ্যতের উৎস হয়, তেমনি দুর্ভাগ্যের নির্মাতাও হয়।’

সুজান নিজেকে ভবিষ্যতের উৎস হিসেবে এবং আমাদের মাঝে উৎসাহের দরজা খুলে দিয়েছেন। জীবনযুদ্ধে তিনি জয়ী হয়েছেন।